মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। শনিবারও দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে দেখা গেছে। একই সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, তাদের ভূখণ্ডে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তিনি দুঃখিত।
তবে সংঘাত থামার কোনো ইঙ্গিত এখনো স্পষ্ট নয়। আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চাইল ইরান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, ইরানের সাময়িক নেতৃত্ব পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে—প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা না হলে তাদের ওপর আর হামলা চালানো হবে না।
তিনি বলেন, ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে যেসব প্রতিবেশী দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের কাছে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইছেন।
গত এক সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরব জানিয়েছে যে তাদের আকাশসীমা ও অবকাঠামোর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব হামলায় হোটেল, বন্দর ও তেল স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে গোটা অঞ্চলে
ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত ইতোমধ্যে ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো অঞ্চলে প্রভাব ফেলেছে। ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির দিকে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তেহরানের সামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা শুরু হয়েছে।
এক পর্যায়ে তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরেও হামলার খবর পাওয়া যায়।
হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে
ইরানের জাতিসংঘ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩৩২ জন ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলে ইরানের হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া কয়েকজন মার্কিন সেনাও নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

আত্মসমর্পণের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হবে না যদি না তারা নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে।
ট্রাম্পের মতে, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ইরানকে আবার অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা যেতে পারে।
তবে ইরান এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান বলেছে, তাদের দেশের নেতৃত্ব নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী এবং শুধুমাত্র ইরানের জনগণের ইচ্ছায়, বিদেশি কোনো হস্তক্ষেপ সেখানে গ্রহণযোগ্য নয়।
যুদ্ধ থামাতে আহ্বান পুতিনের
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানে বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন এবং অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
টেলিফোনে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপে পুতিন বলেছেন, সংঘাত দ্রুত থামানো প্রয়োজন।
ইরান জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অধিকার রক্ষায় রাশিয়ার সমর্থন আশা করছে।

তেলবাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ
এই সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল প্রতিদিন যে প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল ও গ্যাস পরিবহনকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
সংঘাত থামার সম্ভাবনা অনিশ্চিত
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষমা চাওয়ার বক্তব্য আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকায় যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা এখনো ক্ষীণ।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















