সাধারণত পিএইচডি সম্পন্ন করার পর একজন গবেষককে ডক্টরাল শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধায়ক হতে আট থেকে দশ বছর সময় লাগে। কিন্তু সেমিকন্ডাক্টর বিজ্ঞানী জিয়াং জিয়ানফেং মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। মাত্র ৩০ বছর বয়সী এই গবেষক ২০২৪ সালের জুনে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর অল্প সময়ের জন্য ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)-তে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি চীনে ফিরে পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান গবেষক, সহযোগী অধ্যাপক এবং পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
ইনডিয়াম সেলেনাইড নিয়ে গবেষণা
জিয়াং জিয়ানফেংয়ের গবেষণার মূল বিষয় দুই-মাত্রিক ইনডিয়াম সেলেনাইড বা ইনএসই। এই উপাদানকে অনেক বিশেষজ্ঞ ভবিষ্যতের চিপ প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। কারণ এটি বর্তমানের সিলিকন-নির্ভর প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং চিপ শিল্পে নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ডিপটেককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জিয়াং বলেন, স্নাতক পর্যায়ের গবেষণা প্রকল্প থেকেই তিনি ইনএসই সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে কাজ করছেন। শানডং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেকিং বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে এমআইটি—এই নয় বছরের গবেষণা যাত্রা তার কাছে যেন মুহূর্তের মতো কেটে গেছে।

শিক্ষাজীবনের অর্জন
জিয়াং ২০২০ সালে শানডং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টস অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। এরপর ২০২৪ সালে পেকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মান ‘মে ফোর্থ মেডেল’ পান।
সিলিকন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা
বর্তমানের সিলিকন-ভিত্তিক চিপ প্রযুক্তি ক্রমশ তার ভৌত সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে। বিশেষ করে ৩ ন্যানোমিটার এবং এর চেয়েও ক্ষুদ্র প্রযুক্তিগত স্তরে উচ্চ কর্মক্ষমতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে পরমাণু-পুরুত্বের নিম্নমাত্রিক উপাদান যেমন ইনএসইকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব উপাদানে কোয়ান্টাম প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা মুরের সূত্রের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সহায়ক হতে পারে।
মুরের সূত্র অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিপের কর্মক্ষমতা দ্বিগুণ হয় এবং দাম কমে আসে। কিন্তু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই ধারা অনির্দিষ্টকাল ধরে বজায় রাখা সম্ভব নয়।
জিয়াংয়ের গবেষণা বলছে, তার তৈরি দুই-মাত্রিক ইনএসই প্রযুক্তি কর্মক্ষমতার বিভিন্ন সূচকে ইন্টেলের ৩ ন্যানোমিটার প্রযুক্তিকেও ছাড়িয়ে গেছে এবং শক্তি দক্ষতার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিকভাবে অগ্রগামী ফলাফল দেখিয়েছে।
গবেষণা থেকে শিল্পে যাওয়ার পথ
জিয়াংয়ের মতে, ইনএসই সেমিকন্ডাক্টরের সম্ভাবনা অনেক বড় হলেও গবেষণাগার থেকে শিল্প পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগবে। তিনি মনে করেন, এটি সম্ভবত প্রায় দশ বছরের একটি প্রযুক্তিগত বিবর্তনের প্রক্রিয়া।
তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, দুই-মাত্রিক সেমিকন্ডাক্টর অনেকটা এমন একটি ধাঁধার মতো, যাকে নতুনভাবে সাজানো যায়। এগুলো সিলিকনের প্রায় সব কার্যক্ষমতা ধারণ করতে পারে এবং শক্তি দক্ষতার ক্ষেত্রে আরও উন্নত হতে পারে।
তার মতে ভবিষ্যতের চিপ আরও ছোট, দ্রুত এবং শক্তি-সাশ্রয়ী হবে—যা তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সাফল্য
গত বছরের ১৭ জুলাই জিয়াং ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন, যেখানে ইনএসই সেমিকন্ডাক্টরের সমন্বিত উৎপাদন প্রযুক্তিতে বড় অগ্রগতির কথা তুলে ধরা হয়। তিনি এই গবেষণাপত্রের সহ-প্রথম লেখক এবং যোগাযোগকারী লেখক ছিলেন।
এই গবেষণার মাধ্যমে ইনএসই ডিভাইসকে একক পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে উন্নীত করে ওয়েফার-স্তরের প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। এর ফলে বৃহৎ পরিসরে একীভূত দুই-মাত্রিক ইলেকট্রনিক্স তৈরির পথ খুলেছে এবং মুরের সূত্র-পরবর্তী চিপ প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই কাজ শুধু উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন দুই-মাত্রিক ডিভাইসের উৎপাদন ও সিস্টেম একীকরণে অগ্রগতি আনেনি, বরং শিল্পক্ষেত্রেও ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। এর ফল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ইন্টেল এবং সেমিকন্ডাক্টর রিসার্চ কর্পোরেশনে তাকে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে বক্তব্য দিতে বলা হয়।
এর আগে ২০২৩ এবং ২০২৫ সালে ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় জিয়াং প্রথমবারের মতো পরীক্ষাগারে দেখান যে একটি ইনএসই ডিভাইস শক্তি দক্ষতার ক্ষেত্রে সিলিকন প্রযুক্তিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। পরবর্তীতে তার ওয়েফার-স্তরের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয় এই গবেষণার ওপর।

পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন গবেষণা দল
চীনে ফেরার আগেই গত বছরের অক্টোবরে পেকিং বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ওয়েবসাইটে ঘোষণা দেয় যে জিয়াং নতুন পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং পোস্টডক্টরাল গবেষক নিয়োগ দিচ্ছেন।
ঘোষণায় বলা হয়, তার গবেষণা দল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং এবং স্বয়ংচালিত প্রযুক্তির মতো জাতীয় কৌশলগত ক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করবে।
নতুন গবেষণাগার উন্নত নিম্নমাত্রিক সেমিকন্ডাক্টর ইলেকট্রনিক্স নিয়ে কাজ করবে। এর লক্ষ্য হবে ত্রিমাত্রিক সমন্বিত ডিভাইস এবং সার্কিট স্থাপত্যের মৌলিক বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত সমস্যাগুলো সমাধান করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অত্যন্ত শক্তি-দক্ষ চিপ প্রযুক্তি তৈরি করা।
দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত
জিয়াং জিয়ানফেং বলেন, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত কোনো তাৎক্ষণিক আবেগের ফল নয়। বরং এটি তার কাছে স্বাভাবিক একটি সিদ্ধান্ত।
তার মতে, নতুন উপাদান ও ডিভাইসকে শিল্প পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা দল প্রয়োজন। পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিম্নমাত্রিক ইলেকট্রনিক্স নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণার ভিত্তি রয়েছে, তাই সেখানে নিজের দল গঠন করে ধারাবাহিকভাবে গবেষণা করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পেশাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তিনি নিজেকে একটি প্রশ্ন করেন—তার গবেষণা যদি দেশের প্রয়োজনীয় কোনো ক্ষেত্রে সামান্য অবদানও রাখতে পারে, তবে সেটি কেবল একাডেমিক কাজ করার চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ।
এই ভাবনাই তাকে শেষ পর্যন্ত পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে।

প্রেরণা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
চায়না সায়েন্স কমিউনিকেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জিয়াং জানান, বিদেশে মাত্র দেড় বছর কাটানোর পর দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের পেছনে তার পিএইচডি উপদেষ্টা পেং লিয়ানমাওয়ের একটি বক্তব্য বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
পেং বলেছিলেন, একটি দেশ যেখানে শক্তি বাড়াতে চায় সেখানে শিকড় গেড়ে বসতে হবে এবং সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী উঠে দাঁড়াতে হবে।
পেং লিয়ানমাও পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক্স স্কুলের ডিন এবং চীনা বিজ্ঞান একাডেমির সদস্য। ২০২৩ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, চীনের চিপ প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই অনুসরণকারী অবস্থান থেকে এগিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।
তার আশা, আগামী দশকের মধ্যে চিপ প্রযুক্তির বড় বাধাগুলো দূর করা সম্ভব হবে এবং মানুষ সম্পূর্ণভাবে চীনে তৈরি চিপ ব্যবহার করতে পারবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















