ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আধুনিক জনমত জরিপের যুগে এক বিরল নজির তৈরি করেছেন। জনসমর্থন ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করা প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন।
যুদ্ধের শুরুতেই জনসমর্থনের অভাব
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট যখন বিদেশে যুদ্ধ শুরু করেন, তখন দেশের মানুষ প্রথমে তাকে সমর্থন দেয়। পরে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে, হতাহতের সংখ্যা বাড়লে এবং জয়ের সম্ভাবনা কমে গেলে সেই সমর্থন কমতে থাকে। কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।
ইরানের বিরুদ্ধে তার শুরু করা সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে সেই প্রাথমিক সমর্থনের ঢেউ দেখা যায়নি। বরং যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জনমতের বড় অংশ এতে আপত্তি জানিয়েছে।
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, এই অভিযানের পক্ষে জনসমর্থন অনেক কম। রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে সমর্থন মাত্র ২৭ শতাংশ। আর সিএনএনের জরিপে সমর্থন ছিল ৪১ শতাংশ। অতীতের প্রেসিডেন্টদের যুদ্ধ শুরুর সময় যে জনসমর্থন মিলত, তার তুলনায় এটি অনেক কম।

যুদ্ধ দীর্ঘ হলে রাজনৈতিক চাপ বাড়বে
ইতিহাস বলছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ সাধারণত আরও অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাই শুরুতেই নেতিবাচক জনমত ভবিষ্যতে ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান দলের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে। সেখানে কংগ্রেসের এক বা দুই কক্ষ হারানোর ঝুঁকিও রিপাবলিকানদের সামনে দেখা দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সমর্থনের বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারণায় ডেমোক্র্যাটদের একটি বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি
এই বিরোধিতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধের ইতিহাসও বড় কারণ। গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় অনেক আমেরিকান ক্লান্ত।
তাই আরেকটি নতুন সামরিক অভিযানের প্রতি মানুষের আগ্রহ কম। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মেরুকরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অনেকেই ইরানের কঠোর শাসনব্যবস্থার বিরোধী হলেও ট্রাম্পের নেতৃত্বে নতুন যুদ্ধকে সমর্থন করতে দ্বিধায় পড়েছেন।

জনগণকে বোঝাতে উদ্যোগের অভাব
আরেকটি বড় বিষয় হলো, ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণকে যথেষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। সাধারণত প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধ শুরু করার আগে দেশের মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন—কেন যুদ্ধ দরকার, এর লক্ষ্য কী এবং কিভাবে তা শেষ হবে।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে এ বিষয়ে স্পষ্টতা নেই। কখনও ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, কখনও যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়েও দ্বিধা দেখা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার ডি. ফিভার বলেন, ট্রাম্প অনেক ক্ষেত্রেই এমন কাজ করেছেন যা আগে অন্য প্রেসিডেন্টরা ভাবেননি। তবে এই সিদ্ধান্ত তার জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকিগুলোর একটি।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
জনমত জরিপ নিয়ে ট্রাম্প নিজে খুব একটা উদ্বিগ্ন নন। তিনি বলেন, জরিপ নিয়ে তিনি চিন্তা করেন না। তার মতে, তিনি যা করেছেন তা সঠিক সিদ্ধান্ত।
তার ভাষায়, এই পদক্ষেপ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিটও বলেন, প্রেসিডেন্ট মনে করেন জনগণ তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে। তিনি দাবি করেন, অনেক সংবাদমাধ্যম বিষয়টি ভুলভাবে তুলে ধরছে।

ইতিহাসে যুদ্ধের শুরুতে জনসমর্থন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বেশিরভাগ মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শুরু করার সময় জনগণের সমর্থন পেয়েছেন। কোরিয়া, ভিয়েতনাম, গ্রেনাডা, কুয়েত, সোমালিয়া, বসনিয়া, হাইতি, কসোভো, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া এবং সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের শুরুতে জনসমর্থন ছিল।
গ্যালাপ জরিপ অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশের ইরাক যুদ্ধের শুরুতে সমর্থন ছিল ৮৩ শতাংশ। ২০০১ সালে আফগানিস্তান যুদ্ধে জর্জ ডব্লিউ. বুশের সমর্থন ছিল ৯০ শতাংশ।
এমনকি ২০১১ সালে বারাক ওবামার লিবিয়া অভিযানের ক্ষেত্রেও সমর্থন বিরোধিতার চেয়ে বেশি ছিল।
কেন জনসমর্থন গুরুত্বপূর্ণ
ইতিহাসবিদ মাইকেল বেসচলসের মতে, যুদ্ধের সময় জনসমর্থন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধের পথে বাধা, ক্ষতি এবং হতাহতের ঘটনা ঘটতেই পারে।

তখন প্রেসিডেন্টকে জনগণকে বোঝাতে হয় কেন এই ত্যাগ স্বীকার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের হামলার প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধ শুরু করলে সাধারণত জনগণের সমর্থন বেশি থাকে। যেমন পার্ল হারবারের পর রুজভেল্ট বা ৯/১১ হামলার পর জর্জ ডব্লিউ. বুশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান যুদ্ধ সেই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে না।
বিশ্বাস সংকটে আমেরিকা
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রে সরকারের প্রতি মানুষের বিশ্বাসও আগের তুলনায় অনেক কম। জরিপে দেখা গেছে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের অসন্তোষ রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস, সুপ্রিম কোর্ট, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদমাধ্যম—সবকিছুর প্রতিই মানুষের আস্থা কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন এক সময়ে স্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়া যুদ্ধ শুরু করলে জনগণের সন্দেহ আরও বাড়ে। আর সেই অবিশ্বাসের পরিবেশে যুদ্ধ পরিচালনা করা যে কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















