ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক হামলা চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিংকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। বেইজিং মনে করছে, বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তি প্রদর্শনের এই প্রবণতা প্রমাণ করছে—নিজস্ব সামরিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা আরও বাড়ানো জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা থেকে নতুন শিক্ষা
গত সপ্তাহে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলা, যেখানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনাকে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছে।
বহু বছর ধরেই শি জিনপিং তার দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক চাপ সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন। তিনি চীনের সেনাবাহিনীকে এমন এক শক্তিশালী বাহিনীতে রূপান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। শি একে বলেছেন “ইস্পাতের মহাপ্রাচীর” গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
তার মতে, সম্ভাব্য আক্রমণকারীদের সঙ্গে তাদের ভাষায় কথা বলতে হলে শক্তির প্রয়োজন। যুদ্ধের ক্ষমতা থাকলেই শান্তি ও সম্মান নিশ্চিত করা সম্ভব।

ট্রাম্পের সামরিক কৌশল চীনের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
শি জিনপিং দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের আগ্রাসী সামরিক অবস্থান সেই পরিকল্পনাকে আরও জরুরি করে তুলেছে।
গত বছর কঠিন বাণিজ্যযুদ্ধের পর দুই দেশের মধ্যে একটি ভঙ্গুর সমঝোতা রয়েছে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বেইজিংয়ে শি ও ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা। কিন্তু ইরানে হামলা এবং ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার মতো ঘটনাগুলো চীনের কাছে বড় উদ্বেগের কারণ।
খামেনি ও মাদুরো দুজনই বেইজিংয়ের কৌশলগত অংশীদার ছিলেন। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি শি জিনপিংকে লক্ষ্যবস্তু করবে না। তবু এই ঘটনাগুলো বেইজিংকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রই তাদের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী।
এশিয়ায় নতুন ভূরাজনৈতিক আশঙ্কা
চীনের অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েছে। তাই পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে একই ধরনের ভূমিকা নিতে দেওয়া উচিত নয়।
হংকংয়ের চাইনিজ ইউনিভার্সিটির শেনঝেন ক্যাম্পাসের অধ্যাপক ঝেং ইয়ংনিয়ান বলেছেন, জাপান বা ফিলিপাইন যেন “পূর্ব এশিয়ার ইসরায়েল” হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।

আরেক বিশ্লেষক শেন ডিংলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রদর্শন চীনকে নতুন করে শক্তির ভারসাম্য মূল্যায়ন করতে বাধ্য করছে।
১৯৯১ সালের যুদ্ধের মতো নতুন সতর্কবার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত চীনের জন্য অনেকটা ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো সতর্কবার্তা। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত অস্ত্রশক্তি দেখে চীন তাদের সেনাবাহিনী আধুনিকীকরণ শুরু করেছিল।
এবারও চীনের সামরিক বাহিনী সামাজিক মাধ্যমে পাঁচটি শিক্ষা তুলে ধরেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে উন্নত আগ্নেয়শক্তির গুরুত্ব এবং আত্মনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তা। বিশেষ করে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে বিদেশি নির্ভরতা কমানোর বিষয়টি জোর দেওয়া হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ হুমকি নিয়ে সতর্কতা
চীনের সামরিক বিশ্লেষণে আরেকটি বড় বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে “অভ্যন্তরীণ শত্রু”। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা এবং তথাকথিত রঙিন বিপ্লবের আশঙ্কা নিয়ে সতর্ক।
সম্প্রতি সিআইএ চীনের সামরিক বাহিনীতে গুপ্তচর নিয়োগের উদ্দেশ্যে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বহু জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা অপসারিত হওয়ায় এই পরিস্থিতি কাজে লাগাতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।

আলোচনার সময়েও হামলা: চীনের সন্দেহ
চীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চললেও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। কারণ ইরানে হামলার সময়ও কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল।
চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এই ঘটনা দেখিয়েছে কূটনীতি কখনো কখনো শক্তিশালী দেশের ইচ্ছার হাতিয়ারে পরিণত হয়।
সাবেক চীনা সামরিক কর্মকর্তা সং ঝংপিং বলেন, চীনের জন্য শিক্ষা খুব স্পষ্ট—প্রতিপক্ষ সবসময় নিয়ম মেনে চলবে এমন ধারণা করা যাবে না। তারা হঠাৎ আঘাত হানতে পারে।
চীনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি বৃদ্ধি
শি জিনপিং ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছেন। চীনের বিশাল নৌবাহিনী, স্টেলথ ড্রোন এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য তৈরি।
এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের খনন ও প্রক্রিয়াকরণেও চীনের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে এসব খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের নতুন পাঁচ বছর পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং অন্যান্য কৌশলগত প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির নতুন প্রতিযোগিতা
চীনের বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প দুজনই শক্তির গুরুত্ব বোঝেন। তবে সেই শক্তি ব্যবহারের কৌশলে তাদের পার্থক্য রয়েছে।
বেইজিং নিজেদেরকে বিশ্ব স্থিতিশীলতার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরতে চায়। যদিও তাইওয়ান প্রণালী ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক তৎপরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে।
পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ওয়াং দং বলেন, চীনের শক্তি মূলত আত্মরক্ষা ও স্থিতিশীলতার জন্য, সম্প্রসারণের জন্য নয়।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বর্তমান ঘটনাগুলো সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত।
তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, চীনও শেষ পর্যন্ত অন্য বড় শক্তির মতোই বিদেশে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারে।
র্যান্ড চায়না রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক জুড ব্ল্যাঞ্চেট বলেন, বড় শক্তিগুলোর মতো চীনও ধীরে ধীরে এমন সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইবে, যা নিজের সীমান্তের অনেক দূর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















