যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর ওপর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপ বাড়ানোর পর কানাডা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছেন।
প্রতিরক্ষায় যৌথ সহযোগিতার উদ্যোগ
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি শুক্রবার জাপানে পৌঁছান। এটি ছিল তার দশ দিনের সফরের অংশ, যার মধ্যে ভারত ও অস্ট্রেলিয়াও ছিল। এই তিনটি দেশের সামনে এখন একটি বড় প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র যদি নিরাপত্তা সহযোগিতায় আগের মতো ভূমিকা না রাখে, তবে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে শক্তিশালী করা যাবে।
টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকের পর কার্নি জানান, দুই দেশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কার্নি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শক্তিশালী করা। তাকাইচির মতে, এই ধরনের উদ্যোগ একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে।

যদিও ঘোষিত চুক্তিগুলো বেশিরভাগই অ-বাধ্যতামূলক এবং কিছু আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, তবুও এগুলো ভবিষ্যতে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে যৌথ সামরিক মহড়া ও অভিযান বৃদ্ধি, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং সামুদ্রিক আইন প্রয়োগে সমন্বয়।
সফরে নিরাপত্তা ইস্যুর গুরুত্ব
কার্নির সফরসঙ্গীদের তালিকাতেও নিরাপত্তা ইস্যুর গুরুত্ব স্পষ্ট ছিল। অটোয়া থেকে যাত্রা শুরুর সময় তার সঙ্গে চারজন মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু টোকিওতে পৌঁছানোর সময় মন্ত্রিসভা থেকে কেবল প্রতিরক্ষামন্ত্রীই সফরে ছিলেন।
এটি দেখায় যে সফরের শেষ অংশে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতাই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল।
সামরিক ব্যয় বাড়াচ্ছে তিন দেশ
কানাডা, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া—তিন দেশই বর্তমানে সামরিক ব্যয় বাড়ানোর পথে রয়েছে। কানাডা বিশেষভাবে পরিকল্পনা করছে, এতদিন যে বিপুল অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর কাছে যেত, তার বড় অংশ এখন দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ করা হবে।
এর একটি বড় কারণ ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা। তিনি মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন এবং এমনকি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথাও বলেছেন।

বর্তমানে কানাডার সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সরঞ্জাম কেনার পেছনে যায়।
ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক ওয়েসলি ওয়ার্ক বলেন, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও কানাডা বিভিন্ন মাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে এখন তারা বুঝতে পারছে, অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে টেকসই নয় এবং এটি তাদের স্বাধীন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
অস্ত্র কেনার পরিকল্পনায় পরিবর্তন
কানাডা আগে ৮৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করেছিল। তবে কার্নি সেই প্রকল্প পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছেন। বিকল্প হিসেবে সুইডেনের একটি কোম্পানির তৈরি তুলনামূলক সস্তা যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে, যেগুলো ভবিষ্যতে কানাডাতেই তৈরি করা যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যে পারমাণবিক সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া উভয় দেশই উদ্বিগ্ন, কারণ যুক্তরাষ্ট্র তাদের এসব সামরিক প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার ও মূল প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার দিতে রাজি হয়নি।
মধ্যম শক্তিগুলোর ঐক্যের আহ্বান
কার্নি বিশ্বের তথাকথিত “মধ্যম শক্তি” দেশগুলোকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর পেছনে বড় কারণ হলো ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি।
কানাডার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ি শিল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ দুই দেশের সম্পর্ককে উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে কার্নির এই সফরে প্রতিরক্ষার পাশাপাশি অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ও বড় গুরুত্ব পেয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে সহযোগিতা
অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মতো জাপানও কানাডার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে। কানাডায় ইউরেনিয়াম, লিথিয়াম ও নিকেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুত রয়েছে।
এছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে কানাডার নতুন উদ্যোগেও জাপানের আগ্রহ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং বাণিজ্য পথ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় জাপান তার জ্বালানি সরবরাহ বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে। বর্তমানে দেশটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
গাড়ি শিল্পে কানাডা-জাপান সম্পর্ক
কার্নি সফরের সময় জাপানের গাড়ি শিল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। টয়োটা ও হোন্ডা কানাডায় তৈরি গাড়ির প্রায় ৭০ শতাংশ উৎপাদন করে। এই গাড়ির বেশিরভাগই পরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়।
জাপানি কর্মকর্তারা আশা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তি নবায়ন হলে কানাডার কারখানাগুলোর ভবিষ্যৎ আরও স্থিতিশীল হবে। এই চুক্তি এ বছর পর্যালোচনার জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
দুই নেতার ভিন্ন পটভূমি

কার্নি ও তাকাইচির ব্যক্তিগত পটভূমি একেবারেই ভিন্ন। তাকাইচি দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদ এবং তরুণ বয়সে তিনি একটি হেভি মেটাল ব্যান্ডে ড্রাম বাজাতেন। তিনি ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের একজন বড় ভক্ত।
অন্যদিকে কার্নি রাজনীতিতে আসার আগে বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ে কাজ করেছেন এবং কানাডা ও ইংল্যান্ড—দুই দেশেরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। অক্সফোর্ডে পড়াশোনার সময় তিনি হকি দলের গোলরক্ষক ছিলেন। মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময় আগে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি টোকিওতে একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের হয়ে কাজ করেছিলেন। টোকিও সফরের সময় তিনি জাপানি ভাষায় বক্তৃতার একটি অংশ দেওয়ারও চেষ্টা করেন।
যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরতার যুগ কি শেষ?
বিশ্লেষক ওয়েসলি ওয়ার্কের মতে, অনেকেই মনে করেন ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাময়িক এবং সময়ের সঙ্গে তা কেটে যাবে। কিন্তু তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অটল নির্ভরতার যে ধারণা এতদিন ছিল, সেই যুগ এখন শেষ হয়ে আসছে।
তার ভাষায়, এক সময় এসব দেশ মনে করত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা অপরিবর্তনীয় বাস্তবতা। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছে, নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য নতুন পথ খুঁজে বের করা জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















