চীন ও উরুগুয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে নতুন সহযোগিতার পথে হাঁটতে শুরু করেছে। দুই দেশ ২০টিরও বেশি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার লক্ষ্য ক্যানসার চিকিৎসা, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ক্ষতিকর পোকা দমন এবং রোবটিক্সসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্র।
এই উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। এতদিন সম্পর্ক মূলত কাঠের পাল্প, সয়াবিন ও গরুর মাংসের মতো পণ্যের বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বিজ্ঞান সহযোগিতায় চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার
উরুগুয়ের ন্যাশনাল এজেন্সি অব রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন (এএনআইআই)-এর সভাপতি আলভারো ব্রুনিনি সম্প্রতি চীন সফরের পর বলেন, মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণায় চীন উরুগুয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
তিনি জানান, সফরটি মূলত বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয়েছিল। এতে গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

তার মতে, দুই দেশের সহযোগিতার আগ্রহই যৌথ গবেষণা প্রকল্প গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থী ও গবেষকদের পারস্পরিক বিনিময়ের পথ খুলে দিয়েছে।
গবেষণা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের নতুন সুযোগ
উরুগুয়ের প্রতিনিধি দল চীন সফরে গিয়ে যৌথ গবেষণার অর্থায়ন, নতুন অংশীদারিত্ব এবং জৈবপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নত প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ খুঁজেছে। বিশেষ করে কৃষিতে ব্যবহারের জন্য ড্রোন ও রোবট প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ব্রুনিনি বলেন, নতুন মেয়াদে উরুগুয়ে সরকার বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
গত বছর মার্চে প্রেসিডেন্ট ইয়ামান্দু অরসি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিজ্ঞান খাতে রাজনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হয়েছে। সরকারের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রোবটিক্স ও নতুন উদ্যোগ নিয়ে জ্ঞান বিনিময়
চীনের রোবটিক্স খাতে অগ্রগতি উল্লেখ করে ব্রুনিনি বলেন, প্রতিনিধি দল চীনের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান চীনা বিজ্ঞান একাডেমির সঙ্গে নতুন স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছে।
পশুপালন খাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিক বা উকুন নিয়ন্ত্রণ। উরুগুয়ের পশুপালনে এটি বড় সমস্যা। এই পরজীবী প্রাণীরা গবাদিপশুর অসুস্থতা তৈরি করে এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

সম্প্রতি চীনে পাঠানো গরুর মাংসে টিকনাশকের মাত্রা নির্ধারিত সীমার বেশি পাওয়ার পর উরুগুয়ের প্রাণিসম্পদ, কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রণালয় টিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় আরও কঠোর তদারকি শুরু করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে উরুগুয়ের কিছু প্রতিনিধি চীনের সঙ্গে পশুর টিকা উন্নয়নেও সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ব্রুনিনি বলেন, এ বিষয়ে ভবিষ্যতে যৌথ কাজের সম্ভাবনা রয়েছে।
যৌথ গবেষণা ও গবেষক বিনিময়
এএনআইআই ভবিষ্যতেও চীনা বিজ্ঞান একাডেমি এবং চীনের ন্যাশনাল ন্যাচারাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা চালিয়ে যাবে।
ব্রুনিনি বলেন, মৌলিক এবং প্রয়োগভিত্তিক গবেষণায় একসঙ্গে কাজ করা, গবেষকদের পারস্পরিক বিনিময় এবং যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে পেশাগত উন্নয়ন ঘটানো—এসব ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সুযোগ।
ক্যানসার গবেষণায় ন্যানোপ্রযুক্তি
উরুগুয়ের প্রধান উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব দ্য রিপাবলিক ইতোমধ্যে চীনের কিংদাও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত বায়ো-ন্যানো-ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণাগার সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে।

এই গবেষণাগারে বর্তমানে চীনের ৩৮ জন এবং উরুগুয়ের ১২ জন গবেষক কাজ করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন অনুষদের ডিন এবং এই গবেষণাগারের সদস্য আলভারো মোমব্রু বলেন, চীনের মতো বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে কাজ করার ফলে গবেষণার ফল দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োগে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে।
গবেষণাগারে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ওষুধ সরবরাহের নতুন ন্যানোপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো মুক্ত মৌল বা ফ্রি র্যাডিক্যাল ব্যবহার করে টিউমার কোষ ধ্বংস করার পদ্ধতি।
পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ প্রযুক্তি
পানি ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রেও নতুন সহযোগিতা শুরু হতে যাচ্ছে। উরুগুয়ের টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি চীনের ওয়াটার রিসোর্সেস ও হাইড্রোপাওয়ার গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কাজ করবে।

এই যৌথ গবেষণায় পানি পরিশোধনসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খোঁজা হবে।
উরুগুয়ের উপদেষ্টা আলভারো পেনা বলেন, উরুগুয়ে বর্তমানে বন্যা, খরা, সেচ এবং পানির মানের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একই ধরনের সমস্যা চীনেও রয়েছে। তাই এই সহযোগিতা দুই দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
কৃষি পোকা দমনে নতুন গবেষণা
এছাড়া টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি চীনের বেইজিং ফরেস্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে একটি গবেষণাগার স্থাপন করবে।
এই গবেষণাগারে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ও ড্রোনের চিত্র ব্যবহার করে কৃষি ক্ষতিকর পোকা শনাক্ত, পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের কাজ করা হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















