মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর সাম্প্রতিক হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর নেতৃত্ব কাঠামোর ভেতরে ভুল বোঝাবুঝির কারণে এসব হামলা ঘটেছে।
পেজেশকিয়ান জানান, ইরানের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে—প্রতিবেশী কোনো দেশের ভূখণ্ড থেকে ইরানের ওপর আক্রমণ না হলে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো হামলা চালানো হবে না। তবে এই ঘোষণার পরও উপসাগর অঞ্চলে নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা ইরানের সামরিক নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
সংঘাতের বিস্তার
শনিবার উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যায়। এর ফলে বাহরাইন, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা করে।
এ ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের রাজনৈতিক ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব সামরিক কার্যক্রমের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির সামরিক বাহিনীর ওপর কার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ইরানের সামরিক নেতৃত্ব কাঠামো
ইরানের সামরিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সরাসরি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন।
বিশেষ করে আইআরজিসি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং বিদেশে পরিচালিত সামরিক অভিযানের মূল দায়িত্বে থাকে। সাধারণত এই বাহিনী নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার কাছে জবাবদিহি করে।
সর্বোচ্চ নেতা নিহত হলে কী হয়
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা মারা গেলে বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে একটি অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ তার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই পরিষদ নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে।
এই পরিষদ সাধারণত তিন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়—
দেশের প্রেসিডেন্ট
বিচার বিভাগের প্রধান
একজন জ্যেষ্ঠ আলেম, যাকে বিশেষজ্ঞ পরিষদ মনোনীত করে
তাত্ত্বিকভাবে এই পরিষদ সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ নেতার সব ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে, যার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বও অন্তর্ভুক্ত।

যুদ্ধের সময় জটিলতা
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চলাকালে এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা কার্যকরভাবে সামরিক নির্দেশনা দেওয়া কঠিন করে তুলতে পারে।
আইআরজিসি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক সময় স্থানীয় কমান্ডাররাই সরাসরি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যখন বলেন যে বাহিনীর ভেতরে ‘যোগাযোগের ভুল’ হয়েছে, তখন বিশ্লেষকরা মনে করেন—কিছু হামলা হয়তো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ ছাড়া ঘটেছে।
বিশেষ করে আইআরজিসি যেহেতু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী পরিচালনা করে এবং আঞ্চলিক সামরিক কার্যক্রমের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাই তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের সীমিত ক্ষমতা
আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব খুবই সীমিত।
সাধারণত প্রশাসনিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো রাজনৈতিক নেতারা পরিচালনা করেন। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা এবং সামরিক অভিযান সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ নেতা এবং আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারদের হাতে থাকে।
এখন সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ায় সংঘাতের সময় আইআরজিসির প্রভাব আরও বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একজন বিশ্লেষকের মতে, শান্তিকালেও ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র থাকে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর হাতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বাহিনীই সম্ভবত হামলা চালানোর বিষয়ে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।

কঠোর অবস্থানের নেতৃত্ব
আইআরজিসির নতুন কমান্ডার আহমদ ভাহিদিকে সংগঠনের কট্টরপন্থী নেতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, তার নেতৃত্বে বাহিনী আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা দেশের সব সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তার অধীনেই বিপ্লবী গার্ড, নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী পরিচালিত হয়।
খামেনি নিহত হওয়ার পর আপাতত অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদের হাতে সেই ক্ষমতা গেছে। এদিকে বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যদিও তাত্ত্বিকভাবে অন্তর্বর্তী পরিষদ সর্বোচ্চ নেতার সমান ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, বাস্তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিপ্লবী গার্ডের শক্তিশালী ভূমিকা কমান্ড কাঠামোকে জটিল করে তুলছে।
কূটনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত
পেজেশকিয়ানের ক্ষমা প্রার্থনা এবং কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনও এই সংঘাতকে আরও বিস্তৃত হওয়া থেকে থামাতে চাইছে।
তবে সামরিক পর্যায়ে বিভক্ত সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের স্বাধীন কার্যক্রম পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















