ভারতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বি.ভি. নাগারথনা সতর্ক করে বলেছেন, সরকার সরাসরি সেন্সরশিপ না করলেও করনীতি, নিয়ন্ত্রণ, মালিকানা আইন ও সরকারি বিজ্ঞাপন বাজেটের মতো নানা উপায় ব্যবহার করে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকে সীমিত করতে পারে।
বিচারপতির সতর্কবার্তা
২৭ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিচারপতি নাগারথনা বলেন, ভারতের গণমাধ্যম আইনি দিক থেকে স্বাধীন হলেও অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
তিনি “সিলেক্টিভ জার্নালিজম”-এর উত্থানের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে গণমাধ্যম আইনি স্বাধীনতা পেলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

নতুন আইন নিয়ে সমালোচনা
সম্প্রতি কার্যকর হওয়া কয়েকটি আইন নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল পার্সোনাল ডাটা প্রোটেকশন আইনকে অনেকেই তদন্তমূলক সাংবাদিকতার জন্য বড় বাধা হিসেবে দেখছেন।
এই আইনের ফলে তথ্য অধিকার আইনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এতে জনস্বার্থের যুক্তিতে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ সীমিত হতে পারে, যা দুর্নীতি অনুসন্ধানে সাংবাদিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এছাড়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী সাংবাদিকদের অনেক ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি নিতে হতে পারে, যা তদন্তমূলক প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
তিন ঘণ্টার মধ্যে কনটেন্ট অপসারণের নির্দেশ
সম্প্রতি ভারত সরকার একটি নতুন নিয়ম চালু করেছে, যার মাধ্যমে ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে তিন ঘণ্টার মধ্যে নির্দিষ্ট কনটেন্ট অপসারণের নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে।
সমালোচকদের মতে, আদালতের অনুমতি ছাড়াই এমন নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা সরকারকে অনলাইনে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দিতে পারে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এই নিয়ম বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সাংবাদিক কারাবাসের ঘটনা
মিডিয়া স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সাংবাদিক রবি নায়ারের কারাদণ্ড নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি শিল্পপতি গৌতম আদানির ব্যবসা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কিছু অভিযোগ প্রকাশ করেছিলেন।
গুজরাটের একটি আদালত তাকে ফৌজদারি মানহানির মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড দেয়। যদিও তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

রাষ্ট্রীয় প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার সরাসরি সংবাদমাধ্যম বন্ধ না করলেও বিভিন্ন উপায়ে প্রভাব বিস্তার করছে। যেমন সরকারি বিজ্ঞাপন এখন অনেক সংবাদপত্রের বড় আয়ের উৎস, ফলে সমালোচনামূলক অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে যায়।
এছাড়া অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বড় করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে, যাদের ব্যবসা অনেক সময় সরকারের নীতির ওপর নির্ভরশীল।
বিকল্প ডিজিটাল মিডিয়ার উত্থান
এই পরিস্থিতিতে কিছু ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক মডেলে স্বাধীন সাংবাদিকতা চালানোর চেষ্টা করছে। তবে তাদের প্রভাব এখনও সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি কঠোর সেন্সরশিপের পরিবর্তে ছোট ছোট নানা বিধিনিষেধ ধীরে ধীরে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার ক্ষেত্র সংকুচিত করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















