ইরানকে ঘিরে এখন এক বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক জুয়া চলছে। এর ঝুঁকি শুধু ইরানের জনগণের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব রাজনীতির জন্যও গভীর। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, আর প্রথম দিকের সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে উঠে এসেছে ইসরায়েলের নাম।
ইরান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার হলেও পুরো কৌশলের বড় অংশই গড়ে উঠেছে ইসরায়েলের যুদ্ধতত্ত্বের ওপর। হঠাৎ আঘাত, বিপুল শক্তি প্রয়োগ এবং শত্রুপক্ষের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা—এই নীতিকেই ইসরায়েল তাদের বিজয়ের পথ বলে মনে করে।
ইসরায়েলের যুদ্ধতত্ত্বের প্রভাব
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে আন্তর্জাতিক আইনকে তারা সম্মান করে। তবে একই সঙ্গে দেশটির নেতারা যুক্তি দেন, বিপজ্জনক অঞ্চলে ছোট একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে তাদের জন্য নিরাপত্তা সবার আগে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেন, তারা যুদ্ধের নিয়ম মেনে চলে, কিন্তু যেসব গোষ্ঠী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখানোর সুযোগ নেই।
তবে গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধ ও বিপুল প্রাণহানির কারণে এক সময় ইসরায়েল পশ্চিমা অনেক মিত্র দেশের কাছ থেকেও সমালোচনার মুখে পড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই সুর বদলাতে শুরু করেছে। এখন অনেক গণতান্ত্রিক দেশের নেতার বক্তব্যেও ইসরায়েলি যুক্তির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান
ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে ইরানে হামলা চালায়। সেই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এই কৌশল ইসরায়েলি চিন্তারই প্রতিফলন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার আগের মেয়াদে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপে অনাগ্রহী ছিলেন। তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে শাসন পরিবর্তনের পক্ষে চাপ দিলেও ট্রাম্প তাতে সম্মত হননি।
এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের জনগণকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উৎসাহিত করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তার বক্তব্য নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

পশ্চিমা মিত্রদের দ্বিধা ও বাস্তবতা
ইরান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সব মিত্র একইভাবে যুক্ত হয়নি। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার প্রথমে মার্কিন বাহিনীকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে অবশ্য তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোকে রক্ষার জন্য সীমিত প্রতিরক্ষামূলক হামলায় সেই ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেন।
স্পেনও মার্কিন যুদ্ধবিমানকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়নি। এর জবাবে ট্রাম্প স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার হুমকি দিয়েছেন।
তবে এসব আঞ্চলিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বাইরে বড় প্রশ্ন হলো—কেন অনেক পশ্চিমা দেশ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানে সমর্থন দিচ্ছে।

জার্মানির বাস্তববাদী অবস্থান
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস এক ধরনের কঠোর বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় আইনি বিতর্কে সময় নষ্ট করার চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
তার মতে, ইরানের সরকার দীর্ঘদিন ধরে নিজ জনগণকে দমন করেছে, হামাস ও হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়েছে এবং পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়েছে।
মের্ৎস স্বীকার করেন, শাসন পরিবর্তন ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও জার্মানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করবে না। কারণ ইউরোপ বহু বছর ধরে ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিয়ম ভাঙার অভিযোগ তুললেও সামরিকভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
তিনি আরও বলেন, ইউরোপ এখন ইউক্রেন রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তাই এই মুহূর্তে মিত্রদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেওয়ার সময় নয়।
সমর্থনে অন্যান্য দেশ
অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং নিউজিল্যান্ডও ইরানে হামলার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ বলেছেন, খামেনির মৃত্যুতে কেউ শোক করবে না।
শুরুতে ফ্রান্স এই অভিযানে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল এবং বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে তোলার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু পরে উপসাগরীয় অঞ্চলে ফরাসি ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন হামলার পর প্যারিসের অবস্থান কঠোর হয়ে যায়।
এখন ব্রিটেন ও জার্মানির সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করতে সহায়তা করবে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে বড় নজির তৈরি করছে। আগে ইরাক যুদ্ধের সময় পশ্চিমা বিশ্বে তীব্র বিতর্ক হয়েছিল। অন্তত তখন জাতিসংঘের অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র কোনো আন্তর্জাতিক অনুমোদনের অপেক্ষা না করেই পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ফলে শক্তিই ন্যায়ের ভিত্তি—এমন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু সহজেই পথ খুঁজে নিচ্ছেন।
অনেক পশ্চিমা দেশ হয়তো এই বিশ্বব্যবস্থা চায়নি। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাদের সেই নতুন নিয়মের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















