বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সম্ভাব্য সংকটের প্রেক্ষাপটে চীনকে তার পশ্চিমাঞ্চলের গভীরে বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা স্থাপনাকে সুরক্ষিত রাখবে, দীর্ঘমেয়াদি রিজার্ভ সংরক্ষণে সহায়তা করবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াবে।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভূগর্ভে সরানোর প্রস্তাব
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না (পাওয়ারচায়না)-এর প্রধান প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ঝাং শিসু বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে মাটির অনেক গভীরে এমনভাবে স্থাপন করা উচিত যাতে সেগুলো নিরাপদ থাকে এবং সহজে শনাক্ত করা না যায়।
চীনা বিজ্ঞান একাডেমির বুলেটিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, কৌশলগত স্থাপনাগুলো—যেমন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তেল ও গ্যাসক্ষেত্র—ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো তৈরির জন্য আদর্শ স্থান হতে পারে। এসব স্থানে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিরল ধাতুর মজুত সংরক্ষণ করা সম্ভব।
প্রবন্ধে বলা হয়, বড় জাতীয় প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূগর্ভে স্থানান্তরকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, যাতে সম্ভাব্য হামলা থেকে সেগুলো সুরক্ষিত থাকে এবং সহজে দৃশ্যমান না হয়।
ভূগর্ভস্থ কৌশলগত টানেল ও ব্যাকআপ ব্যবস্থা তৈরি করলে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
কৌশলগত প্রেক্ষাপট: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা
এই সুপারিশ এমন সময়ে এসেছে যখন চীন তার অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও অবকাঠামোর জন্য কৌশলগত ব্যাকআপ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সম্ভাব্য বহিরাগত চাপ মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবন্ধে বলা হয়েছে, চীনের পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘ সীমান্ত এবং জটিল ভূরাজনৈতিক পরিবেশ রয়েছে। তাই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ভূগর্ভে স্থাপন এবং একটি “ভূগর্ভস্থ কৌশলগত করিডর ও গোপন সহায়তা ব্যবস্থা” তৈরি করা হলে প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে।
তিব্বত ও শিনজিয়াং সীমান্তে প্রতিরক্ষা অবকাঠামো
বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাব দিয়েছেন যে তিব্বত ও শিনজিয়াং অঞ্চলের সীমান্ত এলাকাগুলোতে ভূগর্ভস্থ প্রতিরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলা উচিত।
এছাড়া আঞ্চলিক শহরগুলোতে এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথের পাশে ছোট আকারের সংরক্ষণাগার নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি স্তরভিত্তিক নেটওয়ার্ক তৈরি হবে, যা কেন্দ্রীয় হাব, আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং সীমান্ত অবকাঠামোকে সংযুক্ত করবে।
জরুরি পরিস্থিতির জন্য ভূগর্ভস্থ আশ্রয়
ভূমিকম্প বা অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধারপথ তৈরি করার কথাও বলা হয়েছে।
এ ধরনের অবকাঠামো পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা এবং উদ্ধার কার্যক্রমসহ একটি সমন্বিত জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

জাতীয় নিরাপত্তায় ভূগর্ভস্থ স্থাপনার গুরুত্ব
ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো জাতীয় নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে শারীরিক হামলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর হুমকি থেকে রক্ষা করে তাদের স্থায়িত্ব ও কার্যক্ষমতা বাড়াতে পারে।
পশ্চিমাঞ্চলকে কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলা
এই উদ্যোগ চীনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও শিল্পকে জনবহুল পূর্বাঞ্চল থেকে অপেক্ষাকৃত কম উন্নত পশ্চিমাঞ্চলে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এর ফলে পশ্চিমাঞ্চল কৌশলগত বাফার অঞ্চল ও সম্পদভিত্তিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
পূর্ব উপকূল থেকে শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো সরিয়ে অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে নেওয়ার লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য বাণিজ্য অবরোধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিচ্ছিন্নতা বা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কমানো।
ইরানের সংঘাত থেকে পাওয়া শিক্ষা
ইরানে চলমান সংঘাতও দেখিয়েছে যে যুদ্ধের সময় ভূ-পৃষ্ঠে থাকা অবকাঠামো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় প্লেনাম সভা
২০২৪ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বৈঠক—তৃতীয় প্লেনাম—এ নেতৃত্ব “কৌশলগত অভ্যন্তরীণ অঞ্চল গড়ে তোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের জন্য ব্যাকআপ পরিকল্পনা তৈরি” করার ওপর গুরুত্ব দেয়। এটি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাড়ানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ।
বর্তমানে বেইজিং, সাংহাই ও শেনঝেনের মতো বড় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কেন্দ্রগুলো পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এবং যুদ্ধ বা বড় সংকটের সময় এগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সমন্বয়ের অভাব
যদিও পশ্চিমাঞ্চলে কিছু ভূগর্ভস্থ জ্বালানি প্রকল্প রয়েছে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে এসব প্রকল্পের মধ্যে পর্যাপ্ত কৌশলগত সমন্বয় নেই। অনেক প্রকল্প বিচ্ছিন্ন এবং আকারে ছোট হওয়ায় বড় কৌশলগত প্রভাব তৈরি করতে পারছে না।
তাদের মতে, এসব প্রকল্পকে একত্র করে একটি সমন্বিত জ্বালানি সংরক্ষণ নেটওয়ার্ক ও জাতীয় কৌশলগত রিজার্ভ ব্যবস্থায় যুক্ত করা প্রয়োজন।
পরিবেশগত সুবিধা
পশ্চিম চীনের উচ্চভূমির তৃণভূমি, জলাভূমি এবং নদী উপত্যকাগুলো পরিবেশগতভাবে খুবই সংবেদনশীল। তাই ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো তৈরি করলে ভূমির ওপর নির্মাণ কম হবে এবং পরিবেশের ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।
প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ
তবে কঠিন ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো নির্মাণ করা সহজ নয়। এজন্য বড় ধরনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে এবং আইনি কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
চীনের বেশিরভাগ আইন ও বিধিমালা স্থানীয় পৌর পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য তৈরি হওয়ায় বড় আকারের সমন্বিত ভূগর্ভস্থ প্রকল্প পরিচালনায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া এসব অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক অবস্থার কারণে উচ্চ চাপ, পানির চাপ এবং তাপমাত্রার মতো সমস্যা দেখা দেয়, যা শিলা বিস্ফোরণ, ধস বা অন্যান্য কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির প্রয়োজন
ঝাং শিসু জোর দিয়ে বলেছেন, জটিল ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রযুক্তি ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং সম্ভাব্য দুর্যোগের আগাম সতর্কতা দিতে সহায়তা করবে।
অতি-গভীর ড্রিলিং প্রযুক্তির অগ্রগতি
অতি-গভীর ড্রিলিং প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে এখন প্রকৌশলীরা মাটির প্রায় ৩ হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত ভূতাত্ত্বিক অবস্থা অনুসন্ধান করতে পারেন।
ঝাংয়ের মতে, উন্নত ভূতাত্ত্বিক পূর্বাভাস প্রযুক্তির সঙ্গে এই ড্রিলিং প্রযুক্তি যুক্ত হলে ভূগর্ভের অবস্থার একটি বিস্তারিত ও নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















