ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহ ছিল প্রবল সামরিক হামলা, নেতৃত্বে বড় ধাক্কা এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আঞ্চলিক উত্তেজনার সময়। তবে এত বড় সামরিক সাফল্যের পরও এই যুদ্ধের শেষ লক্ষ্য বা রাজনৈতিক সমাধান কী হবে—তা এখনো পরিষ্কার নয়।
প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অনেক শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিহত হন। এতে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব বড় ধাক্কা খায়। কিন্তু একই হামলায় এমন কিছু কর্মকর্তাও নিহত হন, যাদের যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য আলোচনাকারী হিসেবে দেখছিল। ফলে দ্রুত সমঝোতার সম্ভাবনাও অনেকটাই কমে যায়।
একই সময়ে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে যুদ্ধের ক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রেরও প্রাণহানি ঘটেছে।
যুদ্ধের শুরু: তেহরানে বিধ্বংসী হামলা
যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা ছিল পরে, কিন্তু নতুন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর হামলা ১২ ঘণ্টা আগেই শুরু করা হয়। তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের একটি সরকারি কমপ্লেক্সে ইরানের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বৈঠক নির্ধারিত সময়ের আগে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল এবং সেখানে উপস্থিত ছিলেন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি।
ইসরায়েল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ওই কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। বিস্ফোরণে তেহরানের কয়েকটি ব্লকজুড়ে থাকা স্থাপনাটি ধ্বংস হয়ে যায়।
এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ব্যাপক বিমান হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলায় ইরানের সামরিক নেতৃত্বের অনেক সদস্য নিহত হয়েছে, নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে এবং ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
প্রথম সপ্তাহের সামরিক চিত্র
প্রথম সাত দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায় চার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ছিল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, সামরিক সদরদপ্তর এবং পারস্য উপসাগরে চলাচলকারী জাহাজ।
মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন অঞ্চলজুড়ে ৫০ হাজারের বেশি সৈন্য মোতায়েন করেছে। এতে রয়েছে দুটি বিমানবাহী রণতরী, এক ডজন যুদ্ধজাহাজ এবং বহু বোমারু ও যুদ্ধবিমান।
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। এর বড় অংশ ব্যয় হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও গোলাবারুদে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এখন প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। একইভাবে একমুখী আক্রমণ ড্রোনের ব্যবহারও প্রায় ৮৩ শতাংশ কমেছে।
তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের এখনো প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ড্রোন অবশিষ্ট রয়েছে।

বেসামরিক হতাহতের ঘটনা
যুদ্ধের মধ্যে কিছু বড় ভুলও ঘটেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী ছিল।
এই হামলার দায় এখনো কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি। তবে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ঘটেছে।
ইরানের হিসাবে এখন পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় এক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে বিভ্রান্তি
যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও পরিষ্কার নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর তিনি প্রথমে ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে নামার আহ্বান জানান। কিন্তু পরে যখন এমন কোনো আন্দোলনের লক্ষণ দেখা যায়নি এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয় সরকার টিকে থাকতে পারে, তখন তিনি ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাননি।
এরপর আবার তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষে ইরানের নতুন নেতা নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকবে।
শেষদিকে তিনি ইরানের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবিও জানান এবং সতর্ক করেন যে এখন পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হয়নি—এমন এলাকাও ভবিষ্যতে হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
এই পরিবর্তিত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ এই যুদ্ধের বিপক্ষে।
যুদ্ধের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
যুদ্ধের বিস্তার ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
পারস্য উপসাগরে হামলা ও উত্তেজনার কারণে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে বিমানবন্দর ও আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে।
কাতারে একটি বড় জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন হামলার পর দেশটি অনির্দিষ্টকালের জন্য তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে।
এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই পেট্রোলের দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ২৭ সেন্ট বেড়েছে।
ইরানের কৌশল: “অপারেশন ম্যাডম্যান”
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘর্ষের পর ইরান নতুন একটি সামরিক কৌশল তৈরি করে, যার নাম দেওয়া হয় “অপারেশন ম্যাডম্যান”।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা এবং এর খরচ বাড়িয়ে তোলা, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ইসরায়েলে হামলা, দ্বিতীয় ধাপে আরব দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা এবং তৃতীয় ধাপে বিমানবন্দর, হোটেল বা দূতাবাসের মতো বেসামরিক স্থাপনায় হামলার কথা ছিল।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান এই তিনটি ধাপ বাস্তবায়ন করেছে।
ইরানের একজন শীর্ষ উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক যুদ্ধ নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। তাই যুদ্ধকে বিস্তৃত ও দীর্ঘায়িত করাই তাদের প্রধান কৌশল।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার বিস্তার
যুদ্ধ এখন মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরান বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে তেল ও গ্যাস স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পর্যটনে বড় ধাক্কা লেগেছে।
একই সময়ে ইরানের মিত্র সংগঠন হিজবুল্লাহও সংঘাতে যুক্ত হয়েছে। তারা ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যার জবাবে ইসরায়েল লেবাননে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহর ওপর এখন ইরানের প্রভাব আগের তুলনায় অনেক বেশি।
তবে লেবাননে সংগঠনটির সমর্থকদের মধ্যেই যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্তি দেখা যাচ্ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বড় ধরনের স্থলযুদ্ধ শুরু হলে তাদের স্থায়ীভাবে ঘরছাড়া হতে হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
যুদ্ধের শেষ কোথায়
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক শক্তি স্পষ্টভাবে প্রাধান্য দেখালেও রাজনৈতিক সমাধান এখনো অস্পষ্ট।
ইরানের সরকার এখনো টিকে আছে, নতুন সামরিক নেতৃত্ব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং পাল্টা হামলাও চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে এবং এর ফলাফল পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















