মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব চীনের সার শিল্পে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ক্রমশ তীব্র হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চীনের অর্থনীতি ও কৃষি খাতে। বিশেষ করে সার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সালফার আমদানিতে চীন এখন বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে। এই সংকট এমন সময়ে দেখা দিয়েছে যখন চীনে বসন্তকালীন চাষাবাদ শুরু হচ্ছে, যা দেশটির কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় সরবরাহ সংকট
চীনের সালফারের বড় একটি অংশ আসে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে সাধারণত হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে।
ফলে চীনে সালফারের সরবরাহ কমে যাচ্ছে এবং এর দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার কারণে বাজারে চাপ বাড়ছে।
চীনের সালফার আমদানির ওপর নির্ভরতা
গুওসেন সিকিউরিটিজের একটি প্রতিবেদনের মতে, চীনের মোট সালফার সরবরাহের প্রায় ৪৭ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি আসে ছয়টি পারস্য উপসাগরীয় দেশ থেকে।
এই দেশগুলো হলো:
সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং ইরান।
গত বছর চীন এসব দেশ থেকে প্রায় ৫.৪ মিলিয়ন টন সালফার আমদানি করেছে, যা দেশটির মোট আমদানির প্রায় ৫৫.৭ শতাংশ।
সার উৎপাদনে সালফারের গুরুত্ব
সালফার মূলত ফসফেট সার উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এছাড়া এটি কীটনাশক এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।
চীন বিশ্বের বৃহত্তম শস্য উৎপাদনকারী দেশ। ফলে প্রতি বছর কৃষকদের বিপুল পরিমাণ সার এবং কৃষি রাসায়নিক ব্যবহার করতে হয়। তাই সালফারের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষি উৎপাদনও প্রভাবিত হতে পারে।
সারের দাম বাড়ার আশঙ্কা
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির সার গবেষণা বিভাগের নির্বাহী পরিচালক অ্যালান পিকেট বলেন, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে চীনে সরবরাহ করা সারের গড় মূল্য ছিল প্রতি টন প্রায় ৫২০ মার্কিন ডলার।
তিনি জানান, উত্তর গোলার্ধে প্রধান চাষাবাদ মৌসুম শুরু হওয়ায় দাম আগেই বাড়ছিল। এখন যদি হরমুজ প্রণালীর শিপিং সমস্যার কারণে সরবরাহ আরও কমে যায়, তাহলে দাম আরও বাড়তে পারে।
তার মতে, দেশীয় উৎপাদকরা বসন্তকালীন মৌসুমের জন্য আগে থেকেই কিছু মজুত তৈরি করে রাখে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় সংকট নাও হতে পারে। তবে উৎপাদনের কিছু অংশ প্রভাবিত হতে পারে এবং দেশীয় বাজারে দাম আরও বাড়তে পারে।
বাণিজ্য কার্যত স্থগিত
ওমানে অবস্থানরত এক চীনা কাঁচামাল ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে ওই অঞ্চল থেকে সালফার পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং পরিবহন খরচ দ্রুত বাড়ছে।
তার ভাষায়, একটি কনটেইনার পাঠাতে এখন প্রায় ৩ হাজার ইউয়ান (প্রায় ৪৩৫ ডলার) খরচ হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, অনেক ক্রেতা খোঁজ নিচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বেশিরভাগ চীনা ক্রেতার বড় সরবরাহকারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে, কিন্তু সেই চালানও আপাতত থেমে গেছে।
চীনে সরবরাহ সংকট
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংসি অঞ্চলের এক ক্রেতা, যার পদবি তান, বলেন বর্তমানে বাজারে সালফারের ঘাটতি স্পষ্ট।
তার মতে, এখন যুক্তিসঙ্গত দামে সালফার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং সর্বত্রই সরবরাহ খুব সীমিত।
বাজার পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে
চীনের পণ্যবাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাবলাইম চায়না ইনফরমেশনের বিশ্লেষক লিউ ঝেনপেং বলেন, দেশীয় বাজার এবং বন্দরগুলোতে ইতোমধ্যে সালফারের দাম বেড়েছে।
তবে আপাতত পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। সাধারণত ফসফেট সার উৎপাদকরা এক থেকে দেড় মাসের কাঁচামাল মজুত করে রাখে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সাল থেকেই সালফারের দাম বাড়তে শুরু করায় বড় সার উৎপাদকরা সরবরাহকারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি জোরদার করেছে, যাতে বসন্তকালীন চাষাবাদ মৌসুমে উৎপাদন স্থিতিশীল থাকে।
তেলের বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে
লিউ সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা সালফার বাজারে অন্যভাবেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সালফার মূলত তেল পরিশোধনের একটি উপজাত। যদি যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে এবং রিফাইনারিগুলো উৎপাদন কমিয়ে দেয়, তাহলে সালফার উৎপাদনও কমে যাবে।
এর ফলে বিশ্বব্যাপী সালফারের সরবরাহ আরও সংকুচিত হবে এবং দাম বাড়তে পারে।
সরবরাহ নিশ্চিত করতে চীনের পদক্ষেপ
চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন ফেব্রুয়ারিতে ঘোষণা দিয়েছে যে বসন্তকালীন চাষাবাদ মৌসুম এবং সারা বছরজুড়ে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ ও স্থিতিশীল দাম নিশ্চিত করা হবে।
এ লক্ষ্যে সার উৎপাদকদের জন্য দেশীয় সালফার সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি বন্দরগুলোতেও আমদানিকৃত সালফার ও সার তৈরির কাঁচামাল বহনকারী জাহাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এছাড়া প্রয়োজনে সালফার আমদানি বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত মজুত রাখার জন্যও কোম্পানিগুলোকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















