চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট মোকাবিলায় পাঁচটি মৌলিক নীতির কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি এই সংঘাতকে এমন একটি যুদ্ধ বলে আখ্যা দেন, যা শুরুই হওয়া উচিত ছিল না। চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনের সময় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অবস্থান তুলে ধরেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বেইজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেন।
যদিও এই সংবাদ সম্মেলন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়, তবু এটি ছিল অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। বিশেষ করে দুই বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর প্রচলিত প্রশ্নোত্তর পর্ব বাতিল হওয়ার পর থেকে এই ব্রিফিংয়ের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও চীনের পাঁচ নীতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ওয়াং ই অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানান। তার মতে, এই সংঘাত যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
তিনি সংকট সমাধানের জন্য পাঁচটি মৌলিক নীতি প্রস্তাব করেন। প্রথমত, সব দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামরিক শক্তির অপব্যবহার করা যাবে না। তৃতীয়ত, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। চতুর্থত, সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক পথকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পঞ্চমত, বড় শক্তিগুলোকে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
গাজা সংকট ও দুই রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থন
ওয়াং ই বলেন, গাজায় চলমান মানবিক সংকট মোকাবিলায় চীন একটি দায়িত্বশীল বড় রাষ্ট্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। ইসরায়েল ও হামাসের সংঘাতের ফলে গাজা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি পুনরায় বলেন, জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুই রাষ্ট্র সমাধানই স্থায়ী শান্তির পথ।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য
চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে। ইরান চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী দেশ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীন একই সময়ে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
চীনের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল পাওয়া গেলেও একই সময়ে চীন প্রতিবেশী আরব দেশগুলো থেকেও জ্বালানি আমদানি করে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এসব দেশও প্রভাবিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ সৃষ্টি হলে তা চীনের জ্বালানি সরবরাহেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সংঘাত নিরসনে বিশেষ দূত পাঠানোর মাধ্যমে চীন ইরানকে বোঝাতে চাইছে যে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও তারা একা নয়।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ও সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠক
এই মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কথা রয়েছে, যেখানে তার সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা। ওয়াং ই জানান, ইরান যুদ্ধের কারণে এই বৈঠক বাতিল হওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই।
তার মতে, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে ভুল বোঝাবুঝি এবং ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং বিশ্ব পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
তিনি বলেন, বৈঠকের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই চলছে এবং উভয় পক্ষকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে বিদ্যমান মতপার্থক্যগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং অপ্রয়োজনীয় বাধা দূর করা যায়।
আঞ্চলিক রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা
ওয়াং ই পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যদি চীন ঐতিহ্যগত বড় শক্তির মতো আচরণ করে, প্রতিবেশী অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে এবং ব্লক রাজনীতি উসকে দেয়, তাহলে এশিয়া এত স্থিতিশীল থাকত না।
জাপানের সঙ্গে উত্তেজনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক কীভাবে এগোবে তা মূলত জাপানের ওপর নির্ভর করছে। তিনি অভিযোগ করেন, তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে জাপানের বক্তব্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
চীনের অবস্থান অনুযায়ী তাইওয়ান তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং অন্য কোনো দেশের এতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।
বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা ও জাতিসংঘ সংস্কার
ওয়াং ই বলেন, চীন একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে কাজ করছে যেখানে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় জাতিসংঘের ভূমিকা কেন্দ্রীয় থাকবে। তবে তিনি মনে করেন, বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতিসংঘে সংস্কার আনা প্রয়োজন এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো জরুরি।
তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের যৌথভাবে বিশ্ব পরিচালনার ধারণা, অর্থাৎ তথাকথিত দ্বিমেরু নেতৃত্বের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। তার মতে, পৃথিবীতে দুই শতাধিক দেশ রয়েছে এবং বিশ্ব রাজনীতিকে কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা উচিত নয়।
বাণিজ্য, রাশিয়া ও ইউরোপ প্রসঙ্গ
চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রপ্তানি বড় ভূমিকা রাখছে। গত বছর দেশটি প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল থেকে শিল্প উৎপাদনের অতিরিক্ত সক্ষমতা কমানো এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়ানোর আহ্বান এসেছে।
ওয়াং ই বলেন, কিছু দেশ শুল্ক বাধা তৈরি করছে এবং অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার চেষ্টা করছে। কিন্তু চীন শুধু বিশ্বের কারখানা হিসেবেই নয়, একটি বড় বৈশ্বিক বাজার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও ব্যবস্থার প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সমঝোতা এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা রয়েছে।
ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে উষ্ণ হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে তিনি মনে করেন, সম্পর্ক আরও উন্নত করতে হলে ইউরোপকে চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যু
দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের সঙ্গে উত্তেজনা প্রসঙ্গে ওয়াং ই পরিস্থিতিকে তেমন গুরুতর নয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জানুয়ারিতে চীনা কোস্টগার্ড ফিলিপাইনের নাবিকদের উদ্ধার করেছিল, যা শান্তি, সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বের নতুন বার্তা তুলে ধরে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ বছরই দক্ষিণ চীন সাগর আচরণবিধি নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর আলোচনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি শতাধিক সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন এবং মোট ২১টি প্রশ্নের উত্তর দেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















