ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে সারের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে আমদানিনির্ভর দেশগুলো বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সারের দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ইউরিয়া সার, যা উদ্ভিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাইট্রোজেন সরবরাহ করে। বছরের শুরু থেকে ইউরিয়ার দাম প্রায় ৮৩ শতাংশ বেড়েছে এবং ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর তা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি টন প্রায় ৭১৮ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্ববাজারে ইউরিয়ার বড় অংশ আসে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। একইসঙ্গে ইউরিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশও এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।
সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পারস্য উপসাগরে প্রায় ২০টির বেশি জাহাজে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন সার আটকে আছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো পুরোপুরি ঘাটতি দেখা না গেলেও পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা দ্রুত সংকটে রূপ নিতে পারে।
কোন দেশ কতটা ঝুঁকিতে
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ঝুঁকির মাত্রা এক নয়। যেসব দেশ নিজস্বভাবে সার উৎপাদন করতে পারে, যেমন ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া, তারা তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে থাইল্যান্ড সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশটি ২০২৫ সালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ১৮ লাখ টন নাইট্রোজেন কাঁচামাল আমদানি করেছে, যা তাদের মোট আমদানির ৫৫ শতাংশ। সরকার জানিয়েছে, আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত মজুত থাকলেও এরপর সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সংকট দেখা দিতে পারে।
স্থানীয় উৎপাদন থাকলেও সমস্যা
ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস ও উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি জটিল। অনেক কোম্পানির হাতে মাত্র ৪৫ দিনের ইউরিয়া মজুত রয়েছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দাম নির্ধারিত হওয়ায় দেশীয় উৎপাদন থাকলেও উচ্চমূল্যের চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।
কৃষিতে সম্ভাব্য প্রভাব
নাইট্রোজেন ফসলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কৃষকরা এটি এড়িয়ে যেতে পারেন না। ধান, ভুট্টা ও গমের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের জন্য এটি অপরিহার্য।
উচ্চমূল্যের কারণে ছোট কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, বিশেষ করে যারা রাবার, কফি, চিনি ও কোকো উৎপাদন করেন। অন্যদিকে পাম তেলের উচ্চমূল্যের কারণে এ খাত তুলনামূলকভাবে কিছুটা সুরক্ষিত থাকতে পারে।
সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা
পারস্য উপসাগরের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে রপ্তানি বন্ধ থাকায় গুদামগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এতে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সরবরাহ সংকট ডেকে আনতে পারে।
দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হলেও এক পর্যায়ে উচ্চমূল্যের কারণে চাহিদা কমে যেতে পারে। তবে তখন নতুন সমস্যা তৈরি হবে—কৃষকরা সার কিনতে দেরি করলে উৎপাদন কমে যাবে এবং ফসলের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইরানকে ঘিরে সংঘাত শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি বড় সতর্ক সংকেত, কারণ আমদানিনির্ভরতা তাদের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সামনে আরও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















