উপকূলজুড়ে নদী আছে, জাল আছে, ট্রলার আছে—তবুও নেই জীবিকার পথ। কারণ একটাই, ডিজেলের তীব্র সংকট। দেশের বিভিন্ন নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলে জ্বালানি না পেয়ে মাছ ধরার কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লাখো জেলে পরিবার চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।
নদী আছে, তবু নৌকা চলছে না
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর এলাকার জেলে রণজিৎ চন্দ্র দাসের মতো অসংখ্য জেলে কয়েক দিন ধরে নৌকা ঘাটে বেঁধে বসে আছেন। বাজারে ডিজেল না থাকায় কিংবা অতিরিক্ত দামে কিনতে বাধ্য হওয়ায় অনেকেই নদীতে নামতে পারছেন না। কেউ কেউ বেশি দামে জ্বালানি কিনে গেলেও সেই খরচ তুলতে পারছেন না। ফলে আয় বন্ধ, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বৈশ্বিক অস্থিরতায় স্থানীয় সংকট
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের মৎস্য খাতে। ডিজেলের অভাবে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার নদী কিংবা সাগরে যেতে পারছে না। এতে মাছ আহরণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামনে নিষেধাজ্ঞা, বাড়ছে দুশ্চিন্তা
এই সংকটের মধ্যেই সামনে আসছে টানা ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। জেলেদের আশঙ্কা, জ্বালানি সংকটের কারণে কাজ বন্ধ, তার ওপর দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। বছরে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে প্রায় ১৪৮ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয়, যা তাদের জীবিকায় বড় চাপ তৈরি করছে।
খরচ বেড়ে আয় শূন্য
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সমুদ্রগামী ট্রলার পরিচালনার খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি, খাবার, বরফ ও শ্রমিকের মজুরি—সব মিলিয়ে খরচ এত বেড়েছে যে মাছ বিক্রি করে তা তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে অনেক ট্রলার মালিকই এখন ট্রলার ঘাটে বেঁধে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
উপকূলজুড়ে স্থবিরতা
খুলনা, পটুয়াখালী, বরগুনা, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। নদীর ঘাটে সারি সারি নৌকা, খালে নোঙর করা ট্রলার, আর তীরে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন জেলেরা। অনেক জায়গায় মাছের আড়তগুলোতেও কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। মাছ না আসায় শ্রমিক, আড়তদার, পাইকার, বরফকল মালিকসহ পুরো অর্থনৈতিক চক্র স্থবির হয়ে পড়েছে।

জেলেদের ক্ষোভ ও দাবি
অনেক এলাকায় অভিযোগ উঠেছে, পাম্পে তেল না থাকলেও খোলাবাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দিলেই তেল পাওয়া যাচ্ছে। এতে ছোট নৌকার জেলেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কোথাও কোথাও জেলেরা প্রতিবাদ ও অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছেন।
প্রশাসনের আশ্বাস
মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কিছু এলাকায় জ্বালানি সংকটের তথ্য পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সংকট নিরসনের আশাও ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এখনো তেমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















