চীন তার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়তে এক নতুন প্রযুক্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা ২০৩০ ও এর পরবর্তী সময়ে দেশটিকে বিশ্ব প্রযুক্তিতে শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত হয়েছে। এই পরিকল্পনা সরকারি ভাষায় “শিল্প আপগ্রেড”, “নতুন গুণমান উৎপাদনশক্তি” ইত্যাদি শিরোনামে প্রকাশিত হলেও সরল ভাষায় এটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত দুনিয়ার একটি বিস্তৃত স্বপ্নরূপ কাঠামো।
পরিকল্পনার মূল দিক
চীনের পরিকল্পনায় উড়ন্ত ট্যাক্সি, ফিউশন শক্তি, মানুষের মস্তিষ্কে সরাসরি সংযুক্ত ৬জি ডিভাইস, এবং হিউম্যানয়েড রোবট পরিচালিত কারখানা—all কিছুই অন্তর্ভুক্ত। দেশটি ইতোমধ্যেই বৈদ্যুতিক গাড়ি, ক্লিন এনার্জি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রে কিছুটা সাফল্য অর্জন করলেও এই নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তার করা।
চীনের নেতা শি জিন্পিং একটি “আধুনিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র” গড়ার লক্ষ্য ধার্য করেছেন, যার লক্ষ্য ২০৩৫ পর্যন্ত দেশের বার্ষিক প্রতিজন আয়ের পরিমাণ ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ ডলারের মধ্যে নিয়ে আসা। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যে পৌঁছতে পরবর্তী দশকে বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধির হার ৪ থেকে ৮ শতাংশে থাকতে হবে। তবে বিশ্ববাজারে চীনের ভোক্তাদের মনোবিজ্ঞানের মন্দা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সরকার মনে করে শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এই লক্ষ্য সফল করতে পারবে।

নতুন প্রযুক্তিতে গতি দানের উৎসাহ
আগের পরিকল্পনাগুলির মতোই এইবারও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্প নীতিকে একত্রিত করা হচ্ছে। আর্থিক ও স্থানীয় সরকারি তহবিল খুলে দেওয়া হয়েছে যাতে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত হয়। এটি ব্যক্তিগত পুঁজিকেও আকৃষ্ট করছে, কারণ ধারণা করা হচ্ছে সরকারি অংশগ্রহণ ঝুঁকি কমিয়ে দেবে। গবেষণা শহরগুলোতে টেকনোলজিস্ট, মার্কেটিং ও আইনজীবীসহ পেশাদাররা নতুন নতুন কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে আগের লক্ষ্যগুলো সফল হওয়ায় পরিকল্পনাকারীরা আশাবাদী। ২০১৭ সালে চীন ২০২৫ সালের মধ্যে এআইতে বৈশ্বিক শীর্ষস্থান লাভের ঘোষণা দিয়েছিল, যা অনেকেই অবাস্তব মনে করেছিলেন। কিন্তু গত বছরে দেশটির একটি এআই ল্যাব এমন এক মডেল প্রকাশ করে যা মার্কিন মডেলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হয়।
রাষ্ট্র ও বেসরকারি উদ্যোগ
“লো-অ্যালটিচিউড অর্থনীতি” বা ডেলিভারি ড্রোন ও উড়ন্ত ক্যাবের মতো ধারণা চীনের বেসরকারি সেক্টর থেকেই জন্ম নিয়ে সরকারি নজরে এসেছিল। মস্তিষ্ক–কম্পিউটার ইন্টারফেসকে ইতোমধ্যেই “ভবিষ্যতের শিল্প” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টার্টআপগুলো ইতোমধ্যে গবেষণা ও পণ্য চালু করেছে। শহরগুলোতে বিশেষ শিল্প অঞ্চল ও হাসপাতালগুলো মস্তিষ্ক ইমপ্লান্টের জন্য মূল্য নির্ধারণের দিকনির্দেশনা প্রকাশ করেছে।
সন্দেহ ও চ্যালেঞ্জ
তবে এই পরিকল্পনাকে নিয়ে সন্দেহও রয়েছে। পূর্ববর্তী “মেড ইন চায়না ২০২৫”সহ অনেক লক্ষ্যেই সফলতা আসেনি। চীন পুনরায়নযোগ্য প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে বিশ্বে এগিয়ে থাকলেও উন্নত চিপ তৈরিতে পিছিয়ে রয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা একই ধরণের উদ্যোগে একাধিকবার বিনিয়োগ করলে পুঁজির অপচয় হতে পারে এবং প্রযুক্তি ট্যালেন্টের অভাবে উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনাকে প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছে এবং বহু প্রযুক্তি উপাদানের রপ্তানি সীমাবদ্ধ করেছে। নতুন পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত যেকোনো প্রযুক্তি এখনোও মার্কিন সিন্ধান্তগুলোর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাছাড়া প্রযুক্তির উন্নয়নযাত্রা সবসময় সংকটে ভরা; যেমন ফিউশন শক্তি কিংবা কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো ক্ষেত্রগুলো ল্যাবের বাইরে বাস্তবে কার্যকর হবে কি না তা এখনো অজানা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















