দীর্ঘ দশ বছর ধরে দেশজুড়ে আলোচিত কুমিল্লার তনু হত্যা মামলায় আবারও নতুন মোড় তৈরি হয়েছে। বহু প্রতীক্ষিত ডিএনএ পরীক্ষায় এবার তনুর পোশাক থেকে চতুর্থ এক পুরুষের রক্তের নমুনা শনাক্ত হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এই তথ্য মামলার তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতির পথ খুলে দিতে পারে।
তদন্তে যুক্ত কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, তনুর পোশাক থেকে সংগ্রহ করা আলামতে মোট চারজন পুরুষের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনজনের শুক্রাণুর নমুনা এবং আরেকজনের রক্তের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। সম্প্রতি অপরাধ তদন্ত বিভাগ এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে জানায়।
নতুন তথ্য ঘিরে আবার আলোচনায় তনু হত্যা
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রায় এক মাস আগে ডিএনএ বিশ্লেষণের এই প্রতিবেদন তদন্তকারী সংস্থার হাতে আসে। এরপর থেকেই নতুন করে সন্দেহভাজনদের তালিকা যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা এখন আলামত থেকে পাওয়া ডিএনএ বিভিন্ন ব্যক্তির নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।
তিনি বলেন, তদন্ত এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। নতুন এই নমুনা কার, সেটি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই তথ্য মামলার রহস্য উদঘাটনে সহায়ক হতে পারে।
গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তার ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে
এর আগে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল ঢাকায় অভিযান চালিয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার ছিলেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তার ডিএনএ নমুনাও তনুর পোশাক থেকে পাওয়া আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত সেই পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তকারীরা বলছেন, পরীক্ষার ফল হাতে এলেই মামলার তদন্তে আরও স্পষ্টতা আসতে পারে।
দশ বছরেও মেলেনি হত্যার রহস্য
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু। পরে রাতেই ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ঝোপঝাড় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তনুর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো দেশে তীব্র ক্ষোভ ও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত নেমে আসে প্রতিবাদের ঢল। দ্রুত বিচার এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তের দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলন হয়েছে।
ঘটনার পর তনুর বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে পরিবারসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে।
বারবার বদলেছে তদন্ত সংস্থা
তনু হত্যা মামলার তদন্তে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রথমে স্থানীয় পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও পরে মামলাটি যায় গোয়েন্দা শাখার কাছে। এরপর অপরাধ তদন্ত বিভাগ এবং সর্বশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের হাতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এই দীর্ঘ সময়ে ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। প্রতিবারই নতুন করে আশার কথা শোনা গেলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব কমই দেখা গেছে। ফলে শুরু থেকেই তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তনুর পরিবার।
তনুর পরিবারের অভিযোগ
তনুর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আগের বিভিন্ন ডিএনএ পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ তথ্য কখনও প্রকাশ করা হয়নি। তারা বারবার দাবি করেছেন, মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এক দশক পেরিয়ে গেলেও তারা এখনও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছেন। নতুন ডিএনএ তথ্য সামনে আসার পর আবারও তারা আশা করছেন, এবার হয়তো প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে।
তদন্তে নতুন প্রত্যাশা
নতুন ডিএনএ তথ্য প্রকাশের পর আবারও জাতীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে তনু হত্যা মামলা। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এখন মামলার গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডে শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ পায় কি না, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।
তনু হত্যা মামলায় নতুন ডিএনএ তথ্য ঘিরে আবারও আলোচনায় কুমিল্লা। চার পুরুষের উপস্থিতির প্রমাণে তদন্তে নতুন গতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















