র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে আরও জনবান্ধব, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে র্যাবকে এমন একটি দায়িত্বশীল বাহিনীতে রূপান্তর করা হবে, যা মানবাধিকার, আইনের শাসন ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করবে।
সোমবার রাজধানীর উত্তরায় র্যাব সদরদপ্তরে বাহিনীটির ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ
সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, র্যাবকে একটি আধুনিক ও দক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার একাধিক সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ন্যূনতম বল প্রয়োগের প্রশিক্ষণ, মানবাধিকার বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং অপরাধ প্রতিরোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় র্যাবের জন্য একটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে বাহিনীর সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
নতুন আইন ও জবাবদিহি নিশ্চিতের পরিকল্পনা
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, র্যাব পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র আইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতদিন বাহিনীটি বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হলেও এখন সময়ের চাহিদা অনুযায়ী একটি স্পষ্ট আইন প্রয়োজন।
তার ভাষায়, নতুন আইনে বাহিনীর দায়িত্ব, ক্ষমতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা হবে। এজন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
নাম পরিবর্তনের চিন্তাও চলছে
র্যাবের বর্তমান নাম পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, বাহিনীটিকে নতুনভাবে সাজিয়ে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই এই ভাবনা চলছে।
তিনি আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও আধুনিক কৌশল ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে।

পূর্ববর্তী সরকারের সমালোচনা
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময় রাজনৈতিক স্বার্থে র্যাবকে ব্যবহার করা হয়েছিল, যার কারণে বাহিনীটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের দায় পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকার কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের মর্যাদা বজায় রেখে কাজ করার সুযোগ দিতে চায়।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আশাবাদ
র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাহিনীটি পুনর্গঠন ও সংস্কারের মাধ্যমে নতুন আইনের আওতায় পরিচালিত হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে নতুন করে বিবেচনা করতে পারে।
তিনি জানান, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিজ নিজ বাহিনীর আইনি কাঠামোর আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গ
গুম, নিখোঁজ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের তদন্ত কমিশনের হাতে যথেষ্ট আইনি ক্ষমতা ছিল না। এ কারণে বিচারিক জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত আইন সংশোধনের কাজ চলছে। আইন সংস্কার শেষ হলে গুম ও নিখোঁজের মতো ঘটনাগুলোর বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের আওতায় আনা সম্ভব হবে, যাতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সরাসরি ন্যায়বিচার পেতে পারে।
র্যাবের কাঠামো নিয়ে যা জানালেন
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, র্যাব মূলত একটি সমন্বিত এলিট বাহিনী। এতে বাংলাদেশ পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি আনসার, বিজিবি ও বেসামরিক সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
র্যাব সংস্কার, নতুন আইন ও নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীটির ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
র্যাবকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন আইন, সংস্কার ও নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















