সংসদে বৃহস্পতিবার ১৩৩টি অর্ডিন্যান্স পর্যালোচনা করতে গঠিত বিশেষ কমিটি তার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অর্ডিন্যান্সগুলোর মধ্যে প্রায় ২০টি অনুমোদিত হয়নি। এর মধ্যে আছে দুর্নীতি দমন কমিশন অর্ডিন্যান্স, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অর্ডিন্যান্স, পুলিশ কমিশন অর্ডিন্যান্স, গায়েবী হওয়া রোধ ও প্রতিকার অর্ডিন্যান্স এবং রেফারেন্ডাম অর্ডিন্যান্স।
চারটি অর্ডিন্যান্স, যার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি নিয়োগ অর্ডিন্যান্স ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অর্ডিন্যান্স অন্তর্ভুক্ত, বাতিলের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি ১৬টির জন্য সংসদে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে, যা আইনপ্রণেতারা পর্যালোচনা ও আইনগত রূপ দিতে পারবেন।
বিশেষ কমিটির চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন সংসদে সব ১৩৩টি অর্ডিন্যান্সের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।

মধ্যবর্তী সরকারের ১৩৩টি অর্ডিন্যান্সের পর্যালোচনা
মধ্যবর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অর্ডিন্যান্স সংসদের প্রথম বৈঠকে (১২ মার্চ) নিয়ম অনুযায়ী উপস্থাপন করা হয়। পরে সংসদ সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। কমিটি বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন জমা দেয়।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ৯৮টি অর্ডিন্যান্স পূর্ণাঙ্গভাবে পাসের সুপারিশ করা হয়েছে, ১৫টি সংশোধিত আকারে সংসদে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি ২০টির মধ্যে ১৬টি অর্ডিন্যান্স সংসদে বিল আকারে আনতে না বলা হলেও পর্যালোচনা ও উন্নত সংস্করণ আনার সুপারিশ করা হয়েছে। চারটি অর্ডিন্যান্স বাতিল ও সংরক্ষণের জন্য সংসদে বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, একটি অর্ডিন্যান্স সংসদে ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদিত না হলে তার কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।
বাতিলের সুপারিশকৃত চারটি অর্ডিন্যান্স
বাতিল ও সংরক্ষণের জন্য যে চারটি অর্ডিন্যান্স সুপারিশকৃত হয়েছে তা হলো—জাতীয় সংসদ সচিবালয় (মধ্যবর্তী বিশেষ ধারা) অর্ডিন্যান্স, ২০২৪; সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি নিয়োগ অর্ডিন্যান্স, ২০২৫; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অর্ডিন্যান্স, ২০২৫; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধনী) অর্ডিন্যান্স, ২০২৬।
সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের জন্য ২০২৫ সালে মধ্যবর্তী সরকার প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি নিয়োগ অর্ডিন্যান্স জারি করে। এতে ‘সুপ্রীম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ বিচারপতি নিয়োগের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন করবে এবং প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ করবে।
সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সচিবালয় গঠন করা হয়, যা অধীনস্থ আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এতে বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, স্থানান্তর, শৃঙ্খলা ও ছুটি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সচিবালয়ের হাতে থাকবে।
জামায়াত-ই-ইসলামী এই দুই অর্ডিন্যান্স বাতিলের সুপারিশে আপত্তি জানিয়েছে। কমিটিতে দলের তিনজন সদস্য নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।

১৬টি অর্ডিন্যান্স নতুন বিল আকারে সুপারিশকৃত
১৬টি অর্ডিন্যান্স এখন বিল আকারে আনা হয়নি, তবে ভবিষ্যতে শক্তিশালী সংস্করণ আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে—জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধনী) অর্ডিন্যান্স, ২০২৪; রেভিনিউ পলিসি ও রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট অর্ডিন্যান্স, ২০২৫; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫; রেফারেন্ডাম অর্ডিন্যান্স, ২০২৫; গায়েবী হওয়া রোধ ও প্রতিকার অর্ডিন্যান্স, ২০২৫; অ্যান্টি-করাপশন কমিশন (সংশোধনী) অর্ডিন্যান্স, ২০২৫; মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অর্ডিন্যান্স, ২০২৬; তথ্য অধিকার (সংশোধনী) অর্ডিন্যান্স, ২০২৬।
বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্ট আছে ১১টি অর্ডিন্যান্সে। বিরোধীরা বলছে, এই অর্ডিন্যান্সগুলো দেশের স্বার্থে অবিকৃতভাবে পাস হওয়া উচিত।
গুরুত্বপূর্ণ অর্ডিন্যান্স ও বিরোধী মত
অ্যান্টি-করাপশন কমিশন (সংশোধনী) অর্ডিন্যান্সে তদন্ত ক্ষমতা ও গোপন অনুসন্ধান ক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়েছে। তৎকালীন সরকার গুরুতর আর্থিক অপরাধ, বিদেশে সংঘটিত অপরাধও আইনের আওতায় আনে এবং কমিশনের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ অনুযায়ী কমিশন স্বাধীন ও কার্যকরী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়। কমিশন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে এবং গায়েবী হওয়ার ঘটনা সম্পর্কেও তদন্তের ক্ষমতা থাকবে।
গায়েবী হওয়া রোধ ও প্রতিকার অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, গায়েবী হওয়া চলমান অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ভুক্তভোগী বা অভিযোগকারী নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পাবে এবং চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকবে।
পুলিশ কমিশন ও বিরোধী নোট
পুলিশ কমিশন অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী নির্বাচন কমিটির মাধ্যমে পুলিশ কমিশন গঠন করে আইজিপি নিয়োগ সুপারিশ এবং নাগরিক অভিযোগ ও পুলিশি অভ্যন্তরীণ গ্রievenance পরিচালনা করা হবে। এটি সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করা হয়েছে। জামায়াত-ই-ইসলামী এই বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।
সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অর্ডিন্যান্স বাতিল করার সরকারের প্রস্তাবে বিরোধী দলের সদস্যরা বলেছে, এটি বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি বিচার বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও সচিবালয়িক সহায়তা প্রদান করে।
জামায়াতের নোট অব ডিসেন্টে বলা হয়েছে, এই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ‘সুপ্রীম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ নামে ৭ সদস্যের একটি কাউন্সিল গঠিত হয়েছে, যা বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করবে। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
অবশেষে, বিরোধীরা বলছেন, অর্ডিন্যান্সটি অপরিবর্তিতভাবে পাস হলে দুর্নীতি দমন ও বিচার প্রতিষ্ঠা কার্যকর হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















