চলতি বছরে দেশে হামে মৃত্যুর ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ২০ দিনে সন্দেহজনক হামে ৯৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১৬। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামে চারজন এবং নিশ্চিত হামে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে দেখা তথ্য অনুযায়ী, হামে মৃত শিশুদের সংখ্যা ৬১।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ দিনে ৮২৬ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন। সন্দেহজনক আক্রান্তের সংখ্যা ৪,৬২৮। এই সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২০ সালে দেশে হামে আক্রান্ত হয়েছিল ২,৪১০ জন, পরের বছরগুলোতে সংখ্যা ছিল ৪০০-এর কম।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হামে কতজন আক্রান্ত হয় তা নিয়মিত হিসাব করা হয়, কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। দেশে হামের মৃত্যুহার আগে ১০ লাখে ১ শতাংশ ছিল, যা এখন বেড়ে ১৬.৮ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ জানিয়েছেন, “আমি যতটুকু অনুমান করতে পারি, এক বছরে দেশে এত রোগীর মৃত্যু আগে হয়নি।”

হামে মৃত্যু ইতিহাস
দেশে হামের নিরীক্ষণ হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) মাধ্যমে। টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী জানান, ২০১৬ সালে দেশে হামে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১০ শিশুর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়। নমুনা না পাওয়ায় মৃত্যুর কারণ ‘ভারবাল অটোপসি’ পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হয়।
ভারবাল অটোপসি হলো এমন প্রক্রিয়া যেখানে চিকিৎসকের প্রত্যক্ষ সনদ বা হাসপাতালের তথ্য না থাকলে পরিবারের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নির্ধারণ করা হয়।
২০২০ সালে পার্বত্য বান্দরবানে ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল হামে। এরপর দেশে এত মৃত্যুর রেকর্ড নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন জানিয়েছেন, এবার হামে মৃত্যুর সংখ্যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
হামে সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯,৭৪৩। ২০০৫ সালে বেড়ে ২৫,৯৩৪, যা বড় প্রাদুর্ভাবের ইঙ্গিত দেয়। পরবর্তী বছরগুলোতে সংখ্যা কমে আসে, তবে ২০১১ সালে আবার বেড়ে ৫,৬২৫-এ ওঠে। ২০১৬ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ৯৭২।
ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে ৬টি সংক্রামক রোগের টিকা দেওয়া হতো। পরে হেপাটাইটিস বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, রুবেলা ও নিউমোকক্যাল নিউমোনিয়ার টিকাও যুক্ত করা হয়। শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় ৯ মাসে প্রথম ডোজ, ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ। ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে দ্বিতীয় ডোজ কার্যকর করা হয়।
টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। প্রাথমিকভাবে শহরাঞ্চলে কার্যক্রম শুরু হয়, ১৯৮৫ থেকে গ্রামাঞ্চলেও সম্প্রসারিত হয়। ২০১৯-এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এখন দেশের ৮৪ শতাংশ শিশু টিকার আওতায়।
হামের বৃদ্ধি ও কারণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৫ সালে টিকাদানের নিম্নহারই চলতি বছর হামের বৃদ্ধি ঘটানোর প্রধান কারণ। ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি অব মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশনের প্রধান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জানিয়েছেন, “গত বছর পর্যাপ্ত টিকা দেওয়া হয়নি। ডিসেম্বরের মধ্যে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল, কিন্তু তা পূরণ হয়নি। তাই দেশ পিছিয়ে গেছে।”

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















