যুদ্ধ আপাতত থেমেছে, কিন্তু পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। গত কয়েক সপ্তাহে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা সমুদ্রে মাইন পেতে রাখার আশঙ্কায় পরিস্থিতি ছিল অস্থির। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে গেলেও বিপদ কমেনি; বরং পথটি এখন আরও জটিল হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে।
নাজুক যুদ্ধবিরতির মাত্র দুই দিনের মাথায় হরমুজ প্রণালি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ঘিরে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসন বলেছিল, যুদ্ধ থামলেই তেলবাহী ট্যাংকার ও পণ্যবাহী জাহাজের জন্য এই পথ খুলে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। নৌপরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখনো এই প্রণালির ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং সীমিত সংখ্যক জাহাজকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

কাদের জন্য পথ খুলছে ইরান
ইরান এমনসব দেশের জাহাজকে আগে যেতে দিচ্ছে, যারা হয় সরাসরি তার সঙ্গে বাণিজ্য করে, নয়তো তেহরানের দৃষ্টিতে শত্রুভাবাপন্ন নয়। ফলে এই প্রণালি ব্যবহারকারী বহু দেশকে এখন এক ধরনের কঠিন ভারসাম্যের রাজনীতিতে পড়তে হচ্ছে। একদিকে ইরান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র—দু’পক্ষের চাপ সামলে নিজেদের জাহাজ পার করাতে হচ্ছে।
নৌঝুঁকি বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান দেশভিত্তিক ও পৃথক আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদ যাত্রার অনুমতি দিচ্ছে। অর্থাৎ সবাইকে এক নিয়মে সুযোগ দিচ্ছে না। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর অবস্থান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ বিকল্প পথ কার্যত নেই।

ফ্রান্সের জাহাজ কেন আগে গেল
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম ইউরোপের মালিকানাধীন প্রথম যে জাহাজটি ইরানের কড়াকড়ির পর হরমুজ অতিক্রম করতে পেরেছে, সেটি একটি ফরাসি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের। ঘটনাটি কাকতালীয় নয় বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ এর ঠিক আগের দিন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনা ও ন্যাটো নিয়ে তার বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
এতে একটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যেসব ইউরোপীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়, ইরান তাদের তুলনামূলক কম শত্রু হিসেবে দেখছে। ফলে হরমুজে প্রবেশাধিকারও সেই হিসাবেই দেওয়া হচ্ছে।

পাকিস্তান, তুরস্ক, ভারত—নিরপেক্ষতার কূটনীতি
তুরস্ক, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশগুলোও কিছু জাহাজের জন্য পারাপারের অনুমতি পেয়েছে। এদের কারও সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে, আবার কেউ যুদ্ধ প্রশ্নে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে। পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে স্থায়ী সমাধান খোঁজার আলোচনাও হওয়ার কথা।
তুরস্কও তার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। যুদ্ধের কারণে আটকে পড়া তুর্কি জাহাজগুলোর নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে তুরস্ক সক্রিয় ছিল। যুদ্ধবিরতির আগেই তুরস্কের মালিকানাধীন তিনটি জাহাজ পার হতে পেরেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের পক্ষ থেকে এক ধরনের ইঙ্গিত—যারা সক্রিয় নিরপেক্ষতা দেখাবে, তাদের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভারতও যুদ্ধবিরতির আগে আটটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ পার করাতে সক্ষম হয়েছে। একই সময়ে ভারত সাত বছর পর প্রথমবারের মতো ইরান থেকে তেল কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যদিও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, জাহাজ পারাপারের বিনিময়ে ইরানকে আলাদা অর্থ দেওয়ার প্রশ্ন নেই।

যুদ্ধবিরতি, কিন্তু কড়াকড়ি বহাল
বুধবার মাত্র পাঁচটি কার্গো জাহাজ হরমুজ পার হয়েছে, যেগুলোর কোনোটিই তেল বা গ্যাসবাহী ছিল না। ইরানি গণমাধ্যম বলেছে, লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে ট্যাংকার চলাচল আটকে দেওয়া হয়েছে। এখানেই স্পষ্ট হচ্ছে, যুদ্ধবিরতির সীমা ও শর্ত নিয়ে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ব্যাখ্যাগত বিরোধ এখনো রয়ে গেছে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, প্রণালি সবার জন্য খোলা, কিন্তু পানিতে এখনো মাইন আছে এবং যেসব জাহাজ যেতে চায়, তাদের ইরানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এই বক্তব্য সত্য হোক বা না হোক, তা নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
লরাক পথ ও নিয়ন্ত্রণের নতুন কৌশল
ইরান জাহাজগুলোকে এমন একটি বিকল্প পথ ব্যবহার করতে চাপ দিচ্ছে, যেটি তার ভূখণ্ডের আরও কাছে দিয়ে গেছে। এই পথটি লরাক ঘুরপথ নামে পরিচিত। এতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড সহজে জাহাজ যাচাই করতে পারে এবং চাইলে পারাপারের বিনিময়ে অর্থ আদায়ের সুযোগও পায়।
ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা প্রতিটি জাহাজের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার করে আদায় করতে চায়। এই অর্থের একটি অংশ ওমানকে দিয়ে বাকি অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রস্তাবকে ঘিরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এমন সম্ভাবনার কথা বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যৌথভাবে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে এবং আয় ভাগ করে নিতে পারে। তবে এই ধারণা দ্রুতই ব্রিটেনের মতো মিত্রদের আপত্তির মুখে পড়ে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, নৌপথের স্বাধীনতা মানে সেটি বিনা বাধায় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে।
ইউরোপের কঠিন বাস্তবতা
হরমুজ ইস্যুতে সবচেয়ে জটিল অবস্থানে পড়তে পারে ইউরোপ। কারণ পারস্য উপসাগর থেকে আসা তেল ও গ্যাসের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপের নির্ভরতা বেশি। ট্রাম্প ইতিমধ্যে ন্যাটো মিত্রদের সমালোচনা করেছেন, কারণ তারা বলপ্রয়োগ করে এই পথ খুলে দেওয়ার পক্ষে যায়নি। এমনকি তিনি কয়েকবার বলেছেন, হরমুজের সমস্যা ইউরোপের বেশি, যুক্তরাষ্ট্রের কম।
ইউরোপীয় দেশগুলো নাকি ৩৫ সদস্যের একটি জোট গঠনের চিন্তা করছে, যাতে সংঘাত মিটে গেলে প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু সংঘাত পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা সরাসরি ঝুঁকিতে নামতে চাইছে না।

উপসাগরীয় দেশগুলোরও দুশ্চিন্তা
সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোও হরমুজে টোল বা ফি আরোপের ধারণায় অস্বস্তিতে পড়বে। কারণ তাদের অর্থনীতি বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইরানের এই কৌশল যদি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না-ও হয়, তবু এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনায় একটি কার্যকর চাপের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়ে দরকষাকষিতে এর প্রভাব থাকতে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের ধারণা, পারস্য উপসাগরে ঢোকা বা বের হওয়ার অপেক্ষায় প্রায় এক হাজার জাহাজ আটকে আছে। বর্তমান গতিতে এই জাহাজগুলোর খুব অল্প অংশই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পার হতে পারবে। ফলে ইরানের দরকষাকষির শক্তি আরও বাড়ছে।
এ কারণেই অনেকের মতে, হরমুজ প্রণালি ইরানের হাতে সবচেয়ে কার্যকর চাপের অস্ত্র। যুদ্ধ থেমে গেলেও এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে তেহরান বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে একসঙ্গে প্রভাবিত করার অবস্থানে রয়েছে।
এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি টিকে আছে, কিন্তু হরমুজে স্বস্তি ফেরেনি। জাহাজ চলাচল এখন আর শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি হয়ে উঠেছে কূটনীতি, জোটরাজনীতি, বাণিজ্যস্বার্থ এবং শক্তির ভারসাম্যের বড় মঞ্চ। যত দিন না স্থায়ী সমাধান হচ্ছে, তত দিন দেশগুলোকে সম্ভবত নিজেদের মতো করে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথই খুঁজতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















