ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম শুক্রবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিতে তেহরান থেকে কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পাকিস্তানে যাননি। এতে ইসলামাবাদে বহু প্রতীক্ষিত শান্তি-আলোচনা আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তান ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু ইরানপক্ষের এই অস্বীকৃতির পর পুরো পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
আলোচনা আপাতত স্থগিত
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, তাসনিম সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে জানায়, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কিংবা পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ—কেউই দেশ ছাড়েননি। দায়িত্বশীল সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, দুই কর্মকর্তাই তেহরানেই অবস্থান করছেন এবং নিজ নিজ সরকারি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তাসনিমকে একটি সূত্র জানায়, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইরানের একটি প্রতিনিধি দল পৌঁছেছে—কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবর পুরোপুরি মিথ্যা।
একই সূত্র আরও জানায়, যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র লেবাননে যুদ্ধবিরতি রক্ষার প্রতিশ্রুতি কার্যকর না করছে এবং ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হচ্ছে, ততক্ষণ আলোচনা স্থগিত থাকবে।
এই অস্বীকৃতি আসে এমন এক প্রতিবেদনের পর, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে ইরানের একটি প্রতিনিধি দল বৃহস্পতিবার রাতেই ইসলামাবাদে পৌঁছেছে।
ইরানের আরেক সংবাদমাধ্যমও একই অবস্থান জানিয়ে বলেছে, লেবাননে কার্যকর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি-আলোচনায় যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তেহরানের নেই। তাদের সূত্রও জানিয়েছে, কোনো প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে যায়নি।

লেবাননই বড় বাধা
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইরানের পাকিস্তানস্থ রাষ্ট্রদূতের আগের একটি বার্তা। তিনি প্রথমে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছাবে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ইসরায়েলের বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন নিয়ে ইরানের জনগণের সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আমন্ত্রণে ইরানি প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে যাচ্ছে। সেখানে ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে।
কিন্তু লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর সেই বার্তাটি মুছে ফেলা হয়। তেহরান এই হামলাকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছে। বার্তাটি সরিয়ে নেওয়ার ফলে প্রতিনিধি দল সত্যিই রওনা হয়েছে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।
এর আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও লেবাননে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তার ভাষ্য ছিল, এ ধরনের পদক্ষেপ কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, ইরান কখনও লেবাননের জনগণকে ছেড়ে দেবে না।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির এই ব্যবস্থার আওতায় লেবানন পড়ে না।
এর ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার নাজুক সমঝোতা আরও টালমাটাল হয়ে পড়ে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল লেবাননে সবচেয়ে তীব্র হামলা চালায়। মার্চের শুরুতে হিজবুল্লাহ সংঘাতে জড়ানোর পর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় আঘাত, যাতে বুধবার শত শত মানুষ নিহত হয়।

অনিশ্চয়তার মধ্যেও পাকিস্তানের প্রস্তুতি
সব অনিশ্চয়তার মধ্যেও পাকিস্তান আলোচনার আয়োজনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আগেই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে।
শুক্রবার দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের জন্য ‘আগমনী ভিসা’ সুবিধা ঘোষণা করেন। তবে তখনও কোনো পক্ষের আনুষ্ঠানিক আগমনের নিশ্চয়তা মেলেনি।
ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানীর স্পর্শকাতর এলাকা কড়া পাহারায় রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনী ও রেঞ্জার্স মোতায়েন করা হয়েছে, আর প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে শুধু অনুমোদিত ব্যক্তিদের জন্য।
যুক্তরাষ্ট্র কী করছে
মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারও থাকতে পারেন। এর আগে তেহরানের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় তাদের ভূমিকার কথা আলোচনায় এসেছিল।
তবে হোয়াইট হাউস এখনও বৈঠকের ধরন, এটি সরাসরি হবে নাকি পরোক্ষভাবে হবে, এবং কী ফল আশা করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই আলোচনা সত্যিই হবে কি না। পাকিস্তান প্রস্তুত, যুক্তরাষ্ট্র থেকেও প্রতিনিধি পাঠানোর ইঙ্গিত আছে, কিন্তু ইরান লেবাননের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে আপাতত আলোচনায় না যাওয়ার অবস্থানেই আছে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হলে এবং ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হলে, ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ অনিশ্চয়তার মধ্যেই আটকে থাকতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















