বৈশ্বিক উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার মধ্যে চীন বিদেশে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে। এ লক্ষ্যেই বিদেশি বিনিয়োগ, ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় নজরদারির জন্য নতুন একটি দপ্তর গঠন করা হয়েছে।
বিদেশে ছড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্পদ ও বিনিয়োগের ওপর নজরদারি শক্ত করছে চীন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্পদ তদারকি সংস্থা নতুন একটি দপ্তর গঠন করেছে, যার কাজ হবে বিদেশে কার্যক্রম চালানো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া, ঝুঁকি কমানো এবং প্রয়োজনে সংকট মোকাবিলায় সমন্বয় করা।
চীনের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশটির অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন প্রবৃদ্ধির খোঁজে বিদেশি বাজারে দ্রুত বিস্তার ঘটাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে দুর্বল চাহিদা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মুনাফার চাপে বিদেশমুখী বিনিয়োগ এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও।
নতুন দপ্তরের মূল দায়িত্ব
নতুন এই দপ্তর বিদেশে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও সম্পদের তদারকি করবে। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা সম্পদের পুনর্গঠন, কার্যকারিতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ঝুঁকি প্রতিরোধ এবং আকস্মিক সংকট সামাল দেওয়ার দায়িত্বও থাকবে তাদের হাতে। অর্থাৎ, শুধু বিনিয়োগ বাড়ানো নয়, সেই বিনিয়োগকে কীভাবে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত রাখা যায়, এখন সেদিকেই বেশি জোর দিচ্ছে বেইজিং।

কেন গুরুত্ব পাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশে নতুন সুযোগ খুঁজছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটির বিদেশমুখী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১৭৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যদিও বেসরকারি অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও বিদেশে বিস্তার ঘটাচ্ছে, তারপরও চীনের বৈদেশিক বিনিয়োগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে চীনের মোট বহির্মুখী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ মজুদের ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদের আওতায়। এ থেকেই বোঝা যায়, বিদেশে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতির বড় অংশ এখনো রাষ্ট্রীয় খাতনির্ভর।
ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ার প্রভাব
চীনের বিদেশি প্রকল্পগুলো এখন ক্রমেই বেশি ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খনিজ খাতে কিছু বড় প্রকল্প নানা কারণে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ভেনেজুয়েলায় চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটিতে চীনা কার্যক্রমের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা আরোপের সমালোচনাও করেছে বেইজিং।
চীনের দৃষ্টিতে, বিদেশে বিনিয়োগ এখন শুধু ব্যবসায়িক প্রসার নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অবস্থান রক্ষারও অংশ। তাই বিদেশে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর সরাসরি নজরদারি বাড়ানোকে তারা জরুরি বলে মনে করছে।

পাঁচসালা পরিকল্পনায় স্পষ্ট বার্তা
২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদের নতুন পাঁচসালা পরিকল্পনায় চীন স্পষ্ট জানিয়েছে, বিদেশে বিনিয়োগের দিকনির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করা হবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগে নিরাপত্তা যাচাইও জোরদার করা হবে। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান শিল্পখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশে সম্প্রসারণে উৎসাহ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, চীন একদিকে তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে এগিয়ে দিতে চায়, অন্যদিকে সেই বিস্তার যেন ঝুঁকির কারণ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে চাইছে।
নতুন দপ্তরের কাঠামো ও নেতৃত্ব
বিদেশে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদ তদারকির জন্য গঠিত নতুন দপ্তরে চারটি বিভাগ থাকবে। এগুলো আন্তর্জাতিক কার্যক্রম, ঝুঁকি প্রতিরোধ, তদারকি ও শাসনব্যবস্থা, এবং সংকট ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করবে। এই দপ্তরের নেতৃত্বে আছেন ঝু কাই, যিনি আগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক দায়িত্বে ছিলেন।
চীনের নতুন এই উদ্যোগে একটি বিষয় পরিষ্কার—বিদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি এখন সেই বিনিয়োগের নিরাপত্তা, টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা যত বাড়ছে, বিদেশে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণও ততই শক্ত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















