রাজশাহীর বাগমারায় মা ও ছেলের আলোচিত জোড়া হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দীর্ঘ সময় কোনো অগ্রগতি ছিল না। কিন্তু হত্যার পর লুট হওয়া একটি মোবাইল ফোনের খোঁজ করতে গিয়েই তদন্তকারীরা পৌঁছে যান হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীদের কাছে। একের পর এক আটজনের হাতে ঘোরা সেই মোবাইল ফোনই শেষ পর্যন্ত উন্মোচন করে বহুদিনের রহস্য।
হত্যাকাণ্ডের পর অদৃশ্য মোবাইল
২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর রাতে বাগমারার একটি গ্রামে আকলিমা বেওয়া ও তার ছেলে জাহিদ হাসানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর আকলিমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি নিখোঁজ হয়ে যায়। প্রথমদিকে স্থানীয় পুলিশ তদন্ত চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও পরে জানা যায়, তারা প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
এক বছর পর তদন্তের দায়িত্ব যায় পুলিশের বিশেষ তদন্ত সংস্থার কাছে। তখনই তদন্তকারীরা নিখোঁজ মোবাইল ফোনটির সন্ধানে নামেন এবং এর আইএমইআই নম্বর অনুসরণ করে নতুন সূত্র খুঁজে পান।
![]()
আটবার বিক্রি হওয়া ফোন
তদন্তে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পর ফোনটি এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির কাছে বিক্রি হতে থাকে। কখনও ৫০০ টাকা, কখনও ৭০০ টাকায় হাতবদল হয় সেটি। শেষ পর্যন্ত ফোনটি নেত্রকোনার এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়। ফোনটির মালিকানা পরিবর্তনের পুরো শৃঙ্খল বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন কার কাছ থেকে কার কাছে এটি গেছে এবং সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
তদন্তে আরও উঠে আসে, হত্যার পর ঘটনাস্থল থেকেই ফোনটি নিয়ে গিয়েছিলেন হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। এই তথ্যই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পুরোনো বিরোধ থেকেই হত্যার পরিকল্পনা
তদন্তকারীরা জানতে পারেন, আকলিমা বেওয়ার সঙ্গে তার আত্মীয় আবুল হোসেন মাস্টারের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। পাশাপাশি প্রতিবেশী হাবিবুর রহমানের সঙ্গেও তার দ্বন্দ্ব চলছিল। এসব বিরোধের জের ধরেই দুজন মিলে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে উঠে আসে। পরে ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করে মা ও ছেলেকে হত্যা করা হয়।

তদন্ত অনুযায়ী, রাজশাহীর দুর্গাপুর এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েকজন ভাড়াটে খুনি আনা হয়। ঘটনার রাতে তাদের ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল পরিকল্পনা অনুযায়ী। এরপর মা ও ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকরা পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় নিয়ে যায় মোবাইল ফোনটিও।
আদালতের রায়
দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালে আদালত মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আবুল হোসেন মাস্টার, হাবিবুর রহমান এবং ভাড়াটে খুনিদের নেতা আবদুর রাজ্জাককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া আরও কয়েকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এই মামলাটি দেখিয়ে দিয়েছে, একটি ছোট সূত্রও কখনও কখনও বড় অপরাধের রহস্য উন্মোচনে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তদন্তকারীদের ধৈর্য ও প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের ফলেই বহুদিনের অমীমাংসিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্যের জট খুলেছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















