গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম বড় কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন শিগগিরই ইতিহাস হতে যাচ্ছে। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে এই পরিবর্তনকে ঘিরে বিভিন্ন রাজ্যের শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলা কর্মসূচিটি গ্রামীণ পরিবারের জন্য বছরে নির্দিষ্ট সময়ের কাজের আইনি নিশ্চয়তা দিয়েছিল। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সমান মজুরি এবং নিজস্ব পরিচয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ তৈরিতে এই কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে শ্রমিকরা মনে করেন।
নারীদের ক্ষমতায়নের নতুন অধ্যায়
গ্রামের বহু নারী শ্রমিকের মতে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তাদের শ্রমের স্বীকৃতি মিলেছিল। আগে যেখানে নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মজুরিতে বৈষম্য ছিল, সেখানে সরকারি প্রকল্পে সমান মজুরি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ধরে এই কর্মসূচির মোট শ্রমিকের ৫৮ শতাংশেরও বেশি নারী। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নতুন আইনে কী পরিবর্তন
নতুন কর্মসূচিতে বছরে ১০০ দিনের পরিবর্তে ১২৫ দিনের কাজের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের অভিযোগ, কাজের দিনের সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের প্রকৃত নিশ্চয়তা কমে যেতে পারে।
তাদের মতে, আগের ব্যবস্থায় কাজের চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প চালু করা হতো। নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট বাজেট ও বরাদ্দের মধ্যে কাজ সীমাবদ্ধ থাকবে। ফলে বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলে অতিরিক্ত কাজের আবেদন মেটানো কঠিন হতে পারে।
অর্থায়ন নিয়েও প্রশ্ন
নতুন ব্যবস্থায় ব্যয়ের ৬০ শতাংশ বহন করবে কেন্দ্র এবং ৪০ শতাংশ রাজ্য সরকার। শ্রমিক সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে মজুরি পরিশোধেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কয়েকটি রাজ্য ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তাদের আর্থিক চাপের মধ্যে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা সহজ হবে না। ফলে কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

দরকষাকষির শক্তি হারানোর আশঙ্কা
শ্রমিক নেতাদের মতে, কর্মসংস্থানের এই আইনি নিশ্চয়তা গ্রামীণ শ্রমবাজারে একটি ন্যূনতম মজুরি মানদণ্ড তৈরি করেছিল। ফলে বেসরকারি খাতে কম মজুরিতে কাজ করতে শ্রমিকরা বাধ্য হতেন না।
তাদের আশঙ্কা, যদি সরকারি কর্মসংস্থান সীমিত হয়ে যায়, তাহলে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক আবার বেসরকারি শ্রমবাজারে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন। এতে বড় জমির মালিক ও নিয়োগকারীদের সুবিধা বাড়লেও ভূমিহীন শ্রমিক ও নারী কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
কাজ বন্ধ রাখার বিধান নিয়ে উদ্বেগ
নতুন আইনের একটি বিতর্কিত দিক হলো বছরে সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত কাজ স্থগিত রাখার সুযোগ। বপন ও ফসল কাটার মৌসুমে এই বিরতি কার্যকর করা যেতে পারে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষি মৌসুম এক নয়। ফলে একযোগে কাজ বন্ধ থাকলে খরাপ্রবণ ও দরিদ্র এলাকাগুলোতে জীবিকার সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার সমালোচনা
আগের কর্মসূচিতেও উপস্থিতি নথিভুক্তকরণ ও মজুরি প্রদানে প্রযুক্তিগত জটিলতা নিয়ে অভিযোগ ছিল। দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ, সার্ভার সমস্যা কিংবা পরিচয় যাচাইয়ের ত্রুটির কারণে অনেক শ্রমিক কাজ করেও মজুরি পাননি বলে অভিযোগ ওঠে।
নতুন কর্মসূচিতে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো হচ্ছে। এতে স্বচ্ছতা বাড়লেও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে শ্রমিকদের ভোগান্তি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
শ্রমিকদের একটি বড় অংশের দাবি, শুধু নাম পরিবর্তন বা কাঠামোগত রদবদল নয়, প্রকৃত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, যদি কাজ পাওয়া নির্ভর করে বাজেট, অনুমোদন ও কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকারের ওপর, তাহলে ‘কাজের অধিকার’ ধারণাটিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
গ্রামীণ শ্রমিকদের আশঙ্কা, নতুন ব্যবস্থায় কাজের সুযোগ অনিশ্চিত হয়ে গেলে আবারও অনেক পরিবারকে জীবিকার সন্ধানে অন্য এলাকায় পাড়ি জমাতে হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















