১০:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
তথ্যের লড়াইয়ে জয়ী হয় কে: অর্থ, প্রচারণা নাকি বিশ্বাসযোগ্যতা? মাদিবা শার্ট: পোশাক থেকে স্বাধীনতার প্রতীক, জন কানি বললেন ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আমাদের স্যুটের শৃঙ্খল ভেঙেছেন’ ক্রিপ্টো-উপনিবেশবাদের নতুন মুখ: ক্যারিবীয় দ্বীপে সার্বভৌমত্বের নীরব লড়াই ঢাকার কালাবাগানে হোস্টেলে নার্সিং শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার পিরোজপুরের নেছারাবাদেই তৈরি দেশের ৭৫ শতাংশ ক্রিকেট ব্যাট, এবার বৈশ্বিক বাজারে নজর পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসছে গাড়ি, চলতি বছরই রপ্তানি হবে ১০০টি যানবাহন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে ঢাকায় বৈঠক করলেন ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী আকাশে আতঙ্ক, হিথ্রোতে জরুরি অবতরণ: ‘আমি মরতে চাই না’—চিৎকারে কেঁপে ওঠে পুরো কেবিন ডেমোক্র্যাটদের পুরোনো ‘পুলিশের তহবিল কমানোর’ অবস্থান ফের বিতর্কে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন চাপে দল চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মাছের ঘের দখলকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি, নিহত ১, আহত ২

তথ্যের লড়াইয়ে জয়ী হয় কে: অর্থ, প্রচারণা নাকি বিশ্বাসযোগ্যতা?

একটি বন্ধ সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা। যখন রাষ্ট্র নির্ধারণ করে মানুষ কী জানবে, কী শুনবে এবং কী বিশ্বাস করবে, তখন সংবাদ কেবল তথ্য থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার একটি হাতিয়ার। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সবচেয়ে কঠোর সেন্সরশিপও মানুষের কৌতূহলকে পুরোপুরি থামাতে পারে না। বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে একটি ছোট্ট খবর, একটি বিদেশি রেডিও সম্প্রচার কিংবা একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার গল্পও কখনও কখনও প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থা ইউএস এজেন্সি ফর গ্লোবাল মিডিয়া (ইউএসএজিএম)-এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে মনোনীত সারা বি. রজার্স সিনেটে তাঁর শুনানিতে উত্তর কোরিয়ার পলাতক নাগরিকদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনায় নয়; বরং এটি এমন একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যেখানে স্বাধীন তথ্যপ্রবাহকে জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিরা রজার্সকে বলেছেন, তারা প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশের বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবন রয়েছে, যখন তারা গোপনে বিদেশি রেডিও সম্প্রচার বা সংবাদ শুনেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়—তথ্য শুধু মানুষকে অবহিত করে না, এটি কল্পনার পরিসরও তৈরি করে। মানুষ যখন জানতে পারে অন্য কোথাও ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সুযোগ কিংবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রয়েছে, তখন বিদ্যমান ব্যবস্থাকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

A Brief History of Press Freedom | Britannica

এই কারণেই সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে শুধু সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি আন্তর্জাতিক কৌশলেরও অংশ। শীতল যুদ্ধের সময় আয়রন কার্টেনের ওপারে পৌঁছে যাওয়া সম্প্রচার পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম কার্যকর নরম শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। আজও সেই ধারণা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। বরং ডিজিটাল যুগে এর রূপ আরও জটিল হয়েছে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। রাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন থাকতে পারে? ইউএসএজিএম নিজেকে সরকারি প্রচারণার যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং জনস্বার্থভিত্তিক সংবাদসংস্থা হিসেবে তুলে ধরে। তাদের দাবি, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে সরকারি হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করার জন্য আইনগত সুরক্ষা রয়েছে। এই কাঠামোই তাদেরকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম থেকে আলাদা করে।

কিন্তু আইনি সুরক্ষা থাকলেই বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত হয় না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে দর্শক ও পাঠকের আস্থার ওপর। যদি মানুষ মনে করে সংবাদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি, তবে সেটি যতই প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হোক না কেন, তার প্রভাব সীমিত হয়ে পড়বে। অন্যদিকে নিরপেক্ষ, যাচাইযোগ্য এবং সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।

এ কারণেই ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইউএসএজিএমকে ছোট করার উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি ব্যয় কমানো ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের লক্ষ্য থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম সংকুচিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, সমালোচকদের আশঙ্কা হলো—এই প্রক্রিয়ায় যদি স্থানীয় ভাষার সংবাদ, সম্প্রচার অবকাঠামো কিংবা সেন্সরশিপ এড়িয়ে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সংস্থাটির প্রকৃত প্রভাবও কমে যাবে।

রজার্স অবশ্য ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কার্যকারিতা বাড়ানো। ঐতিহ্যগত শর্টওয়েভ রেডিও যেখানে এখনও প্রয়োজন, সেখানে সেটি বজায় থাকবে; পাশাপাশি পডকাস্ট, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও, প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত গ্রুপ চ্যাট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে স্থানীয় ভাষার সাংবাদিকতা পুনর্গঠনের কথাও তিনি বলেছেন।

Meet the think tank planning a second Trump administration. (It's not  Project 2025.) - POLITICO

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈশ্বিক প্রভাবের প্রতিযোগিতা। শুনানিতে দাবি করা হয়, চীন আন্তর্জাতিক প্রচারণা ও প্রভাব বিস্তারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। যদিও এই ব্যয়ের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন হিসাব রয়েছে এবং কোন খাতে কত অর্থ ধরা হয়েছে, তা সবসময় স্পষ্ট নয়। ফলে কেবল সংখ্যার ভিত্তিতে তুলনা করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

আসলে তথ্যযুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করে বাজেট নয়, বিশ্বাসযোগ্যতা। কোটি কোটি ডলার ব্যয় করেও যদি সংবাদকে মানুষ নির্ভরযোগ্য মনে না করে, তবে সেই বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। আবার সীমিত সম্পদ নিয়েও যদি একটি প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে সত্যনিষ্ঠ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পেশাদার সাংবাদিকতা করতে পারে, তবে তার প্রভাব অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

এই বাস্তবতা শুধু উত্তর কোরিয়া, চীন বা ইরানের মতো রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অ্যালগরিদমনির্ভর তথ্যপ্রবাহের যুগে বিশ্বের প্রায় সব দেশই এখন তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন সংকটের মুখোমুখি। ভুয়া তথ্য, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রভাব অভিযানের ভিড়ে সাধারণ মানুষের জন্য সত্যকে শনাক্ত করাই ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

সুতরাং ইউএসএজিএমের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতিফলন—একবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক প্রভাব কি সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে বেশি নির্ধারিত হবে, নাকি নির্ভরযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের ক্ষমতার ওপর?

উত্তরটি সহজ নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: কোনো সংবাদমাধ্যমের শক্তি শুধু তার সম্প্রচারের পরিসরে নয়, বরং তার বিশ্বাসযোগ্যতায় নিহিত। সত্য যদি মানুষের কাছে পৌঁছাতেই না পারে, তবে তার মূল্য সীমিত। আবার সত্য পৌঁছালেও যদি সেটিকে বিশ্বাস করার কারণ না থাকে, তবে তার প্রভাবও ক্ষীণ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তথ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে সেই কণ্ঠস্বর, যাকে মানুষ নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। আর আধুনিক বিশ্বের তথ্যযুদ্ধে সেটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

জনপ্রিয় সংবাদ

তথ্যের লড়াইয়ে জয়ী হয় কে: অর্থ, প্রচারণা নাকি বিশ্বাসযোগ্যতা?

তথ্যের লড়াইয়ে জয়ী হয় কে: অর্থ, প্রচারণা নাকি বিশ্বাসযোগ্যতা?

১০:০০:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

একটি বন্ধ সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা। যখন রাষ্ট্র নির্ধারণ করে মানুষ কী জানবে, কী শুনবে এবং কী বিশ্বাস করবে, তখন সংবাদ কেবল তথ্য থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার একটি হাতিয়ার। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সবচেয়ে কঠোর সেন্সরশিপও মানুষের কৌতূহলকে পুরোপুরি থামাতে পারে না। বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে একটি ছোট্ট খবর, একটি বিদেশি রেডিও সম্প্রচার কিংবা একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার গল্পও কখনও কখনও প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থা ইউএস এজেন্সি ফর গ্লোবাল মিডিয়া (ইউএসএজিএম)-এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে মনোনীত সারা বি. রজার্স সিনেটে তাঁর শুনানিতে উত্তর কোরিয়ার পলাতক নাগরিকদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনায় নয়; বরং এটি এমন একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যেখানে স্বাধীন তথ্যপ্রবাহকে জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিরা রজার্সকে বলেছেন, তারা প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশের বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবন রয়েছে, যখন তারা গোপনে বিদেশি রেডিও সম্প্রচার বা সংবাদ শুনেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়—তথ্য শুধু মানুষকে অবহিত করে না, এটি কল্পনার পরিসরও তৈরি করে। মানুষ যখন জানতে পারে অন্য কোথাও ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সুযোগ কিংবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রয়েছে, তখন বিদ্যমান ব্যবস্থাকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

A Brief History of Press Freedom | Britannica

এই কারণেই সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে শুধু সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি আন্তর্জাতিক কৌশলেরও অংশ। শীতল যুদ্ধের সময় আয়রন কার্টেনের ওপারে পৌঁছে যাওয়া সম্প্রচার পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম কার্যকর নরম শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। আজও সেই ধারণা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। বরং ডিজিটাল যুগে এর রূপ আরও জটিল হয়েছে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। রাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন থাকতে পারে? ইউএসএজিএম নিজেকে সরকারি প্রচারণার যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং জনস্বার্থভিত্তিক সংবাদসংস্থা হিসেবে তুলে ধরে। তাদের দাবি, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে সরকারি হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করার জন্য আইনগত সুরক্ষা রয়েছে। এই কাঠামোই তাদেরকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম থেকে আলাদা করে।

কিন্তু আইনি সুরক্ষা থাকলেই বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত হয় না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে দর্শক ও পাঠকের আস্থার ওপর। যদি মানুষ মনে করে সংবাদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি, তবে সেটি যতই প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হোক না কেন, তার প্রভাব সীমিত হয়ে পড়বে। অন্যদিকে নিরপেক্ষ, যাচাইযোগ্য এবং সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।

এ কারণেই ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইউএসএজিএমকে ছোট করার উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি ব্যয় কমানো ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের লক্ষ্য থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম সংকুচিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, সমালোচকদের আশঙ্কা হলো—এই প্রক্রিয়ায় যদি স্থানীয় ভাষার সংবাদ, সম্প্রচার অবকাঠামো কিংবা সেন্সরশিপ এড়িয়ে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সংস্থাটির প্রকৃত প্রভাবও কমে যাবে।

রজার্স অবশ্য ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কার্যকারিতা বাড়ানো। ঐতিহ্যগত শর্টওয়েভ রেডিও যেখানে এখনও প্রয়োজন, সেখানে সেটি বজায় থাকবে; পাশাপাশি পডকাস্ট, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও, প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত গ্রুপ চ্যাট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে স্থানীয় ভাষার সাংবাদিকতা পুনর্গঠনের কথাও তিনি বলেছেন।

Meet the think tank planning a second Trump administration. (It's not  Project 2025.) - POLITICO

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈশ্বিক প্রভাবের প্রতিযোগিতা। শুনানিতে দাবি করা হয়, চীন আন্তর্জাতিক প্রচারণা ও প্রভাব বিস্তারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। যদিও এই ব্যয়ের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন হিসাব রয়েছে এবং কোন খাতে কত অর্থ ধরা হয়েছে, তা সবসময় স্পষ্ট নয়। ফলে কেবল সংখ্যার ভিত্তিতে তুলনা করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

আসলে তথ্যযুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করে বাজেট নয়, বিশ্বাসযোগ্যতা। কোটি কোটি ডলার ব্যয় করেও যদি সংবাদকে মানুষ নির্ভরযোগ্য মনে না করে, তবে সেই বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। আবার সীমিত সম্পদ নিয়েও যদি একটি প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে সত্যনিষ্ঠ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পেশাদার সাংবাদিকতা করতে পারে, তবে তার প্রভাব অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

এই বাস্তবতা শুধু উত্তর কোরিয়া, চীন বা ইরানের মতো রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অ্যালগরিদমনির্ভর তথ্যপ্রবাহের যুগে বিশ্বের প্রায় সব দেশই এখন তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন সংকটের মুখোমুখি। ভুয়া তথ্য, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রভাব অভিযানের ভিড়ে সাধারণ মানুষের জন্য সত্যকে শনাক্ত করাই ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

সুতরাং ইউএসএজিএমের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতিফলন—একবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক প্রভাব কি সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে বেশি নির্ধারিত হবে, নাকি নির্ভরযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের ক্ষমতার ওপর?

উত্তরটি সহজ নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: কোনো সংবাদমাধ্যমের শক্তি শুধু তার সম্প্রচারের পরিসরে নয়, বরং তার বিশ্বাসযোগ্যতায় নিহিত। সত্য যদি মানুষের কাছে পৌঁছাতেই না পারে, তবে তার মূল্য সীমিত। আবার সত্য পৌঁছালেও যদি সেটিকে বিশ্বাস করার কারণ না থাকে, তবে তার প্রভাবও ক্ষীণ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তথ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে সেই কণ্ঠস্বর, যাকে মানুষ নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। আর আধুনিক বিশ্বের তথ্যযুদ্ধে সেটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।