দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই কাঠশিল্পের জন্য পরিচিত। তবে গত কয়েক দশকে এই জনপদ বাংলাদেশের ক্রিকেট ব্যাট উৎপাদনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশে স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়া মোট ক্রিকেট ব্যাটের প্রায় ৭৫ শতাংশই উৎপাদিত হচ্ছে এই উপজেলায়। এখন দেশীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন এখানকার উদ্যোক্তারা।
ক্রিকেট ব্যাট তৈরির এই শিল্প শুধু একটি উৎপাদনখাত নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবিকা, দক্ষ কারিগরদের অভিজ্ঞতা এবং দেশীয় কাঁচামালনির্ভর একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
দেশের ব্যাট উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র
স্থানীয় শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নেছারাবাদের ১৫টিরও বেশি গ্রামের ৬৫টির বেশি কারখানায় প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ ক্রিকেট ব্যাট তৈরি হয়। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ।

এখানকার প্রতিটি ব্যাট স্থানীয় কারিগরদের হাতে তৈরি হয়। স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট—দেশজুড়ে বিভিন্ন স্তরের খেলোয়াড়দের কাছে এসব ব্যাট পৌঁছে যাচ্ছে।
দেশীয় কাঠেই তৈরি মানসম্মত ব্যাট
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবহৃত ব্যাট সাধারণত আমদানিকৃত ইংলিশ উইলো বা কাশ্মীর উইলো কাঠ দিয়ে তৈরি হলেও নেছারাবাদের নির্মাতারা দেশীয় কাঠ ব্যবহার করেন। কদম, গাওয়া, নিম, শিশু, শিমুল, ডুমুর ও ছাতিমসহ বিভিন্ন ধরনের কাঠ দিয়ে ব্যাট তৈরি করা হয়।
স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য কাঁচামাল ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম থাকে। একই সঙ্গে মান বজায় রাখতে সক্ষম হওয়ায় এসব ব্যাট দেশের বাজারে ক্রমেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
ছোট উদ্যোগ থেকে সফল শিল্পে রূপান্তর
তিন থেকে চার দশক আগে কয়েকজন কাঠশিল্পীর ছোট পরিসরের উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই শিল্পের। সময়ের সঙ্গে তা বিস্তৃত হয়ে এখন একটি শক্তিশালী কুটিরশিল্পে পরিণত হয়েছে।
একসময় স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকা নেছারাবাদের ব্যাট এখন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়ছে

দেশীয় বাজারে সাফল্যের পর কয়েকজন উদ্যোক্তা এখন বিদেশে রপ্তানির সুযোগ খুঁজছেন। ইতোমধ্যে সীমিত পরিসরে ভারত ও নেপালে স্থানীয়ভাবে তৈরি কিছু ক্রিকেট ব্যাট রপ্তানি হয়েছে, যা এই শিল্পের আন্তর্জাতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, দক্ষ কারিগর, অভিজ্ঞ শ্রমশক্তি এবং দেশীয় কাঁচামালের শক্ত ভিত্তি থাকায় নেছারাবাদের পক্ষে বৈশ্বিক ক্রিকেট সরঞ্জাম বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব।
তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কিছু নীতিগত সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। বিশেষ করে উন্নতমানের উইলো কাঠ সহজে আমদানির সুযোগ, কারিগরদের আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং রপ্তানি প্রক্রিয়ায় আরও কার্যকর সহায়তা পেলে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট ব্যাট উৎপাদন আরও সহজ হবে।
সরকারি সহায়তার আশ্বাস
নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দত্ত বলেন, স্থানীয় নির্মাতারা বিদেশে ক্রিকেট ব্যাট রপ্তানিতে আগ্রহী হলে উপজেলা প্রশাসন সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধার মাধ্যমে সহযোগিতা করবে। শিল্পটি আরও সুসংগঠিত হলে এর সম্প্রসারণে সরকার সর্বাত্মক সহায়তা দেবে বলেও তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে পিরোজপুরের এই শিল্প শুধু দেশের চাহিদা পূরণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















