মাত্র ২৫ হাজার ডলার। জীবনের এক পর্যায়ে এটুকুই ছিল সুধীর রুপারেলিয়ার হাতে থাকা বড় মূলধন। কিন্তু সেই অর্থ নিয়েই তিনি আবার ফিরে গিয়েছিলেন উগান্ডায়। যে দেশে তার পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করছিল, যে দেশ থেকেই মাত্র ১৬ বছর বয়সে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে চলে যেতে হয়েছিল, সেই দেশেই ফিরে এসে তিনি শুরু করেন নতুন জীবন।
আজ সেই ছোট্ট পুঁজি থেকে গড়ে উঠেছে রুপারেলিয়া গ্রুপ—উগান্ডার অন্যতম পরিচিত পারিবারিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। পরিবারের হিসাবে এর মূল্য এখন প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ৩০টি ব্যবসা রয়েছে এই গোষ্ঠীর অধীনে। সম্পত্তি, হোটেল ও আতিথেয়তা, শিক্ষা, ফুলের চাষ, গণমাধ্যম, জনবল নিয়োগ, বীমা, অর্থ ও বিনিয়োগ—বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে আছে তাদের ব্যবসা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সুধীর রুপারেলিয়ার দুই মেয়ে শীনা ও মীরাকে এই সাম্রাজ্যের পরবর্তী নেতৃত্বে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু রুপারেলিয়া পরিবারের এই গল্পের শুরু উগান্ডায়ও নয়। এর শিকড় আরও দূরে—ভারতের গুজরাটে।
গুজরাট থেকে পূর্ব আফ্রিকা
সুধীর রুপারেলিয়া ১৯৫৬ সালে উগান্ডার পশ্চিমাঞ্চলের কাসেসে জেলার কাবাতোরোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি উগান্ডায় জন্মালেও তার পরিবার ভারতীয় গুজরাটি বংশোদ্ভূত।
রুপারেলিয়া পরিবারের ইতিহাস অনুযায়ী, সুধীরের প্রপিতামহ ১৮৯০-এর দশকে ভারত থেকে পূর্ব আফ্রিকায় পাড়ি জমান। তিনি প্রথমে কেনিয়ার মোম্বাসায় যান এবং সেখানে ব্যবসা শুরু করেন। পরে ১৯০৩ সালে পরিবারটি উগান্ডায় চলে আসে। অর্থাৎ সুধীর রুপারেলিয়া উগান্ডার মাটিতে জন্ম নেওয়া তৃতীয় প্রজন্মের গুজরাটি পরিবারের সন্তান।
সেই সময় ভারতের গুজরাটের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। রুপারেলিয়া নিজেই এক সাক্ষাৎকারে তার পারিবারিক শিকড়ের কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, তার প্রপিতামহের পরিবারের ভারতে একটি কৃষিজমি ছিল। সেখান থেকে পরিবারের খাওয়ার ব্যবস্থা হতো এবং কিছু উৎপাদন বাজারেও বিক্রি করা যেত। পূর্ব আফ্রিকায় পাড়ি জমানোর মধ্য দিয়ে পরিবারটি ধীরে ধীরে ব্যবসা ও বাণিজ্যের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
এ কারণে সুধীরের গল্পকে কেবল একজন উগান্ডান ব্যবসায়ীর গল্প বললে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে পূর্ব আফ্রিকায় অভিবাসন, বাণিজ্য এবং কয়েক প্রজন্ম ধরে নতুন দেশে নিজেদের অবস্থান তৈরি করারও একটি গল্প।
উগান্ডাতেই শৈশব
সুধীরের শৈশব কেটেছে উগান্ডায়। তিনি কাম্পালার ব্যাট ভ্যালি প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে জিঞ্জায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে জিঞ্জা সেকেন্ডারি স্কুলে পড়েন এবং ১৯৭১ সালে কাম্পালার কলোলো সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি হন।
কিন্তু পরের বছরই তার জীবনে বড় পরিবর্তন আসে।
১৯৭২ সালে তৎকালীন উগান্ডার শাসক ইদি আমিন দেশটির এশীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেন এবং বহু এশীয় পরিবারকে উগান্ডা ছাড়তে বাধ্য করেন। সেই সময় মাত্র ১৬ বছর বয়সে সুধীরও বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে চলে যান।
এক মুহূর্তে পরিচিত দেশ, পরিচিত পরিবেশ এবং শৈশবের জীবন পেছনে ফেলে তাকে নতুন দেশে গিয়ে নতুনভাবে শুরু করতে হয়।
যুক্তরাজ্যে সংগ্রামের দিন
যুক্তরাজ্যে গিয়ে সুধীর কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে ব্যবসা শুরু করেননি। বরং তাকে বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো কাজ করতে হয়েছে।
কারখানা, সুপারমার্কেট ও কসাইখানায় কাজ করে তিনি অর্থ উপার্জন করেন। সেই অর্থের একটি অংশ সঞ্চয় করতে থাকেন। ব্যবসার জন্য বড় কোনো পারিবারিক মূলধন তার হাতে ছিল না। নিজের শ্রমের আয় থেকেই তিনি ধীরে ধীরে প্রথম পুঁজি তৈরি করেন।
এই সময়ের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তার ব্যবসায়িক মানসিকতার ওপর বড় প্রভাব ফেলে বলে তার জীবনীতে উঠে এসেছে। কঠিন পরিস্থিতিতে কম অর্থ দিয়ে কীভাবে কাজ শুরু করতে হয়, নগদ অর্থের গুরুত্ব কতটা এবং সুযোগ তৈরি হলে সেটি দ্রুত কাজে লাগানো কতটা জরুরি—এসব বিষয়ে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি হয় তখনই।
২৫ হাজার ডলার নিয়ে উগান্ডায় ফেরা
১৯৮৫ সালে সুধীর রুপারেলিয়া উগান্ডায় ফিরে আসেন। তার সঙ্গে ছিল যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন কাজ করে সঞ্চয় করা প্রায় ২৫ হাজার ডলার।
এটি আজকের হিসাবে বিশাল কোনো ব্যবসায়িক মূলধন নয়। কিন্তু সুধীরের কাছে এটি ছিল নতুন করে শুরু করার সুযোগ।
প্রথমদিকে তিনি কেনিয়া থেকে উগান্ডায় বিয়ার ও মদ আমদানির ব্যবসায় যুক্ত হন। কিন্তু বাজারের নিয়ম ও সরকারি নীতির পরিবর্তন তার সেই ব্যবসায় বড় বাধা তৈরি করে। ১৯৮৯ সালে বিয়ার আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা এলে আগের ব্যবসার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
অনেকের কাছে এমন পরিস্থিতি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কারণ হতে পারত। সুধীরের ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে ওঠে নতুন সুযোগের শুরু।
বিয়ার ব্যবসা থেকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে
সুধীর লক্ষ্য করেন, তার ব্যবসার অনেক ক্রেতা বিদেশি এবং তারা বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন করেন। ফলে তিনি বুঝতে পারেন, বিয়ার আমদানি বন্ধ হয়ে গেলেও বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সেখান থেকেই তিনি বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের ব্যবসায় প্রবেশ করেন এবং ক্রেন ফরেক্স ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করেন। রুপারেলিয়া ফাউন্ডেশনের জীবনীতে এটিকে উগান্ডার প্রথম ফরেক্স ব্যুরো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ব্যবসা দ্রুত সফল হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসায় তিনি বড় অবস্থান তৈরি করেন। এরপর তার ব্যবসার পরিধি আর পেছনে ফিরে তাকায়নি।

ব্যাংক থেকে সম্পত্তি—সাম্রাজ্যের বিস্তার
ফরেক্স ব্যবসার পর সুধীর অর্থঋণ ও আর্থিক সেবার দিকে এগিয়ে যান। ১৯৯৫ সালে তিনি ক্রেন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যাংকটি পরবর্তী সময়ে উগান্ডার ব্যাংকিং খাতে গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে ওঠে।
এরপর তিনি বুঝতে পারেন, দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ তৈরির জন্য শুধু আর্থিক ব্যবসার ওপর নির্ভর করলে হবে না। তিনি দ্রুত সম্পত্তি ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে থাকেন।
কাম্পালায় একের পর এক ভবন, বাণিজ্যিক সম্পত্তি, হোটেল ও আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেন। ধীরে ধীরে রুপারেলিয়া নামটি উগান্ডার আবাসন ও সম্পত্তি ব্যবসার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
এর পাশাপাশি শিক্ষা, ফুলের চাষ, আতিথেয়তা, বীমা, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ছড়িয়ে পড়ে। (
আজ রুপারেলিয়া গ্রুপের ব্যবসার পরিধি আরও বিস্তৃত। গ্রুপের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের মূল ব্যবসার মধ্যে রয়েছে আতিথেয়তা, আবাসন ও নির্মাণ, গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপন, ফুল ও কৃষি, অর্থ ও বীমা, শিক্ষা এবং জনবল নিয়োগ।
শুধু সম্পত্তি নয়, শিক্ষা ও সমাজেও বিনিয়োগ
সুধীর রুপারেলিয়ার ব্যবসায়িক দর্শনের আরেকটি দিক হলো শিক্ষা ও সামাজিক বিনিয়োগ।
নিজের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। তিনি কাম্পালা প্যারেন্টস স্কুল ও কাবিরা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। একইভাবে স্পেকে রিসোর্ট মুনিয়োনিও, কাবিরা কান্ট্রি ক্লাবসহ আতিথেয়তা খাতেও বড় বিনিয়োগ করেন।
২০১২ সালে সুধীর ও তার স্ত্রী জ্যোৎসনা রুপারেলিয়া রুপারেলিয়া ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এর লক্ষ্য ছিল সমাজে ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা।
অর্থাৎ তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য কেবল সম্পদ জমা করার প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজও এর অংশ হয়ে উঠেছে।
এখন উত্তরাধিকারীদের সময়
চার দশকের এই যাত্রার পর রুপারেলিয়া পরিবারের সামনে এখন নতুন প্রশ্ন—সুধীরের পর কে সামলাবেন এই বিশাল সাম্রাজ্য?
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, তার দুই মেয়ে শীনা রুপারেলিয়া ও মীরা রুপারেলিয়া ক্রমেই ব্যবসার নেতৃত্বে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন।
মীরা রুপারেলিয়া সম্পত্তি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। রুপারেলিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি মীরা ইনভেস্টমেন্টসের উন্নয়ন বিভাগের নেতৃত্বে রয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত।অন্যদিকে শীনা রুপারেলিয়া অর্থনীতি ও হিসাববিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন। তিনি রুপারেলিয়া গ্রুপের পরিচালক এবং পারিবারিক ব্যবসার বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তার নেতৃত্বের ভূমিকা আরও জোরালো হওয়ার কথা উঠে এসেছে।
দুই মেয়ের নেতৃত্বে রুপারেলিয়া গ্রুপের পরবর্তী অধ্যায় কেমন হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। প্রতিষ্ঠাতা সুধীরের মতো একই ধরনের ব্যবসায়িক আগ্রাসন থাকবে, নাকি নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেবে—সেটিই ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন।
ভারতের শিকড়, উগান্ডার পরিচয়
সুধীর রুপারেলিয়ার গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো তার পরিচয়ের বহুস্তর।
তার পরিবারের শিকড় ভারতীয় গুজরাটে। পূর্ব আফ্রিকায় পরিবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল মোম্বাসা দিয়ে। পরে তারা উগান্ডায় স্থায়ী হয়। সুধীর জন্ম নেন উগান্ডায়, শৈশব কাটান সেখানেই। রাজনৈতিক কারণে কৈশোরে তাকে যুক্তরাজ্যে যেতে হয়। সেখানে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি নিজের পুঁজি তৈরি করেন। তারপর ১৯৮৫ সালে আবার ফিরে আসেন উগান্ডায়—এবার নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ার লক্ষ্য নিয়ে।
সেই ফিরে আসার পর প্রায় চার দশকে গল্পটি বদলে যায় সম্পূর্ণভাবে।
২৫ হাজার ডলার থেকে শুরু করে আজ প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলারের পারিবারিক ব্যবসা—রুপারেলিয়া পরিবারের এই উত্থান শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি অভিবাসন, বাস্তুচ্যুতি, ফিরে আসা, ঝুঁকি নেওয়া এবং সুযোগকে কাজে লাগানোর গল্পও।
আর এখন সেই গল্পের পরবর্তী অধ্যায়ে মঞ্চে উঠছেন শীনা ও মীরা রুপারেলিয়া। তাদের হাতে শুধু একটি ব্যবসা নয়, রয়েছে কয়েক প্রজন্মের তৈরি একটি পারিবারিক উত্তরাধিকার—যার শিকড় ভারতের গুজরাটে, ইতিহাস পূর্ব আফ্রিকায় এবং বর্তমান ঠিকানা উগান্ডা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















