পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিনের সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। তবে একই সঙ্গে দলটি অভিযোগ করেছে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় ভারত কার্যত কূটনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে ছিল এবং দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা জয়রাম রমেশ এক বিবৃতিতে বলেন, আগামী ১৯ জুন জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক সংঘাত বন্ধ হওয়ার যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েল এই সমঝোতা মেনে চলবে এবং অন্তর্বর্তী এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে অঞ্চলে আরও স্থায়ী স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করবে।
হরমুজ প্রণালি খুলে যাওয়ার গুরুত্ব
জয়রাম রমেশ বলেন, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত হলে ভারতের জন্য তা বড় স্বস্তির কারণ হবে। কারণ দেশটির জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল।
তবে তার মতে, পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা কমলেও ভারতের অর্থনীতির গভীরতর সমস্যাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হবে না। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে রুপির ওপর চাপ রয়েছে এবং ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির স্থবিরতা, চীনা পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না।
পাকিস্তানের বাড়তি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
কংগ্রেস নেতা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দিক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন গুরুত্ব অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ইসলামাবাদ নতুন করে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
জয়রাম রমেশের অভিযোগ, পশ্চিম এশিয়া বিষয়ে ভারতের নীতিতে প্রয়োজনীয় ভারসাম্যের অভাব রয়েছে এবং জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে আরও সূক্ষ্ম ও বাস্তবধর্মী কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করা উচিত।

ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
কংগ্রেসের আরেক নেতা পবন খেরাও সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, এই সমঝোতা শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য স্বস্তির খবর হলেও এর আগে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে।
পবন খেরার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার ক্ষেত্রে পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার এবং তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অথচ ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভারত আলোচনার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারেনি।
তার ভাষায়, বৈশ্বিক কূটনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের অবস্থান নিয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, অন্য দেশগুলো যখন আলোচনার ফলাফল গঠনে ভূমিকা রেখেছে, তখন ভারত নীরব দর্শকের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ ছিল।
সম্ভাব্য চুক্তির প্রভাব
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সামরিক কার্যক্রম অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। এতে লেবাননসহ সংঘাতপ্রবণ বিভিন্ন অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছেন, এই আলোচনায় পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং ১৯ জুন জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক মাধ্যমে জানান, ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।
চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলে পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং ভারতের মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















