যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই অতীতের একটি বিতর্ক ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় দলের কিছু নেতার সমর্থিত ‘পুলিশের তহবিল কমানো’ বা ডিফান্ড দ্য পুলিশ ধারণা এখন আবারও নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
ডেমোক্র্যাটরা এবার ভোটারদের বোঝাতে চাইছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অধীনে আইনশৃঙ্খলা, নাগরিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাই দেশের বড় সংকট। কিন্তু বিরোধীরা তাদের ২০২০ সালের অবস্থান সামনে এনে প্রশ্ন তুলছে—জননিরাপত্তা নিয়ে দলটির অবস্থান কতটা বিশ্বাসযোগ্য।
পুরোনো বিতর্কের নতুন মূল্য
দলের অনেক কৌশলবিদ মনে করছেন, কয়েক বছর আগের কিছু চরম অবস্থান এখন পুরো দলের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, অল্পসংখ্যক নেতার বক্তব্যের কারণে ডেমোক্র্যাটদের জননিরাপত্তা নিয়ে অবস্থান নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, নির্বাচনে এগিয়ে থাকতে হলে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। অন্যথায় প্রতিপক্ষই তাদের পরিচয় ও বার্তা নির্ধারণ করে দেবে।
একই সময়ে দলের প্রগতিশীল অংশ আরও জোরালো ভূমিকা নিচ্ছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা অপরাধ, অভিবাসন এবং বামপন্থী নীতির প্রসঙ্গকে নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত করেছে।
উইসকনসিনে প্রার্থীর পুরোনো বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন
উইসকনসিনের গভর্নর পদপ্রার্থী ফ্রান্সেসকা হং এখন এই বিতর্কের অন্যতম আলোচিত মুখ। ২০২০ সালে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের তহবিল কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়েও তিনি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
তবে বর্তমান নির্বাচনী প্রচারণায় তার ভাষা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। সাম্প্রতিক টেলিভিশন বিতর্কে তিনি বলেছেন, গভর্নর হিসেবে পুলিশের অর্থায়ন কমানো তার লক্ষ্য নয়। বরং অপরাধ প্রতিরোধে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তার এই অবস্থান পরিবর্তন দেখিয়ে সমর্থকেরা বলছেন, তিনি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করেছেন। তবে সমালোচকদের দাবি, এটি রাজনৈতিক চাপের ফল।
মিশিগান ও নিউইয়র্কেও একই চিত্র
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়্যেদও অতীতে পুলিশের তহবিল কমানোর পক্ষে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বর্তমানে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সেই অবস্থান তিনি আর সমর্থন করেন না।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিও অতীতে শহরের পুলিশ বিভাগ নিয়ে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন এবং পুলিশের অর্থায়ন কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি সেই ভাষার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং জানান, এখন তিনি পুলিশ বিভাগের তহবিল কমানোর পক্ষে নন।

পরে তিনি তার পূর্বসূরির পুলিশ কমিশনারকেও বহাল রাখেন, যা ব্যবসায়ী মহল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হলেও দলের কিছু প্রগতিশীল সমর্থকের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
জননিরাপত্তা ইস্যুতে বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২০ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। তখন পুলিশি সংস্কার ও জবাবদিহির দাবিই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এখন ভোটারদের বড় অংশ অপরাধ দমন ও নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ফলে অনেক ডেমোক্র্যাট নেতা আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে জননিরাপত্তার প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার নতুনভাবে তুলে ধরছেন।
মেমফিসে ভিন্ন ধরনের বাস্তবতা
টেনেসির মেমফিস শহরে অপরাধ দমন নিয়ে বিতর্ক আরও জটিল। শহরটিতে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হলেও তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সমালোচনা রয়েছে। সাম্প্রতিক দুটি প্রাণঘাতী অভিযানের পর এই সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
স্থানীয় ডেমোক্র্যাট নেতাদের অভিযোগ, কঠোর নিরাপত্তা অভিযান সাময়িকভাবে অপরাধ কমালেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করেনি।
তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করছেন, অধিকাংশ বাসিন্দাই পুলিশের উপস্থিতি পুরোপুরি কমিয়ে দেওয়ার ধারণাকে সমর্থন করেন না। তাদের মতে, মানুষ নিরাপত্তা চায়, তবে সেই নিরাপত্তা যেন জবাবদিহিমূলক ও মানবিক হয়।
নির্বাচনের আগে বড় পরীক্ষা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—অতীতের বিতর্ককে পেছনে ফেলে বর্তমান জননিরাপত্তা নীতিকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা। রিপাবলিকানরা যেখানে ২০২০ সালের বক্তব্যকে নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, সেখানে ডেমোক্র্যাটদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা অপরাধ দমন, সামাজিক বিনিয়োগ এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য গড়ে তুলতে সক্ষম।
নির্বাচনের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করতে পারে ভোটাররা অতীতের বিতর্ককে কতটা গুরুত্ব দেন এবং বর্তমান নীতিকে কতটা বিশ্বাস করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















