দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে আসছিল ব্রিটেন। কিন্তু সেই অবস্থানের সঙ্গে বাস্তব নীতির দূরত্বও ছিল স্পষ্ট। এখন লন্ডন সেই দূরত্ব কিছুটা কমানোর পথে হাঁটছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, বসতি সম্প্রসারণে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, বসতি-সম্পত্তির বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্তদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদারের ঘোষণা—সব মিলিয়ে ব্রিটিশ নীতিতে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি কেবল রাজনৈতিক বার্তা, নাকি এর বাস্তব প্রভাবও পড়বে?
বহু দশকের নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড পার্লামেন্টে নতুন নীতির ঘোষণা দিয়ে বলেন, অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি অবৈধ এবং সেই বাস্তবতার সঙ্গে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সম্পর্কও সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। নতুন ব্যবস্থার আওতায় বসতি থেকে পণ্য আমদানির পাশাপাশি নির্মাণ, অবকাঠামো, অর্থায়ন ও আবাসন ব্যবসার মতো পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও লক্ষ্য করার ক্ষমতা তৈরি করা হবে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বসতি সম্প্রসারণ শুধু জমি দখল বা নতুন ঘর নির্মাণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে অর্থায়ন, ব্যাংকিং, নির্মাণ, জমি বিক্রি, বিপণন এবং নানা ধরনের ব্যবসায়িক সেবা জড়িত। ফলে কেবল পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে বসতি অর্থনীতির একটি সীমিত অংশই স্পর্শ করা সম্ভব।
তবে এখানে সময়ও একটি বড় বিষয়। নতুন আইনগত কাঠামো কার্যকর হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্ব এখনই দৃশ্যমান হলেও এর বাস্তব ফল নির্ভর করবে প্রয়োগের ধরন, আইনি কাঠামো এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করতে ব্রিটেন কতটা সক্ষম হয় তার ওপর।
প্রতীকী পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতা
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এর অর্থনৈতিক পরিসর। ব্রিটেন ইসরায়েলের সঙ্গে সামগ্রিক বাণিজ্য বন্ধ করছে না। নিষেধাজ্ঞা মূলত অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর কেন্দ্রীভূত। ফলে ব্রিটেন-ইসরায়েল বাণিজ্যের সামগ্রিক আকারের তুলনায় তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
কিন্তু অর্থনৈতিক পরিমাণ ছোট হলেই রাজনৈতিক গুরুত্বও ছোট হয়ে যায় না। কোনো সরকার যখন দীর্ঘদিনের নীতিকে বাস্তব নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে প্রয়োগ করতে শুরু করে, তখন সেটি অন্য রাষ্ট্র ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি সংকেত তৈরি করে। বিশেষ করে ইউরোপের অন্যান্য দেশ যদি একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বিচ্ছিন্ন একটি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে বৃহত্তর অর্থনৈতিক চাপের অংশে পরিণত হতে পারে।
এখানেই ব্রিটিশ উদ্যোগের প্রকৃত তাৎপর্য। এটি একা বসতি সম্প্রসারণ থামিয়ে দেবে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্নটি হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি কথায় অবৈধ বলার পর এবার সেই অবস্থানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতি মিলিয়ে নিতে শুরু করছে?
আন্তর্জাতিক আইনের পুরোনো প্রশ্ন
ইসরায়েলি বসতি নিয়ে বিতর্কটি নতুন নয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর অধিকৃত ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনের দীর্ঘদিনের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২ নম্বর প্রস্তাবে যুদ্ধের মাধ্যমে ভূখণ্ড অধিগ্রহণের অগ্রহণযোগ্যতার নীতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছিল এবং ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করা ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তবু প্রায় ছয় দশক ধরে বসতি সম্প্রসারণ থামেনি। বরং পশ্চিম তীরে বসতি, সড়ক, অবকাঠামো ও নতুন আবাসন প্রকল্পের বিস্তার এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যৎ দুই-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ব্রিটেনের নতুন অবস্থানকে দেখতে হবে। কেবল কোনো পণ্যের উৎসের ওপর নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং বসতি অর্থনীতিকে সহায়তা করা পরিষেবা, অর্থায়ন ও প্রচারণার ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। ফলে নীতিটির প্রকৃত পরীক্ষা হবে কতগুলো নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়েছে তা দিয়ে নয়; বরং বসতি সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে এটি কতটা প্রভাব ফেলতে পারে তা দিয়ে।
ইসরায়েলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ ঘোষণার পর ইসরায়েলও পাল্টা পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। ব্রিটিশ কূটনীতিকদের ওপর বিধিনিষেধ এবং পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের হুমকি এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়েছে। ইসরায়েলের ঘোষিত পাল্টা পদক্ষেপের মধ্যে ব্রিটিশ আইনপ্রণেতাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও রয়েছে।
এই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দেয় যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা যত সীমিতই হোক, তার কূটনৈতিক মূল্য থাকতে পারে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন ব্রিটেন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের কথা বলছে এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির পর আরও সক্রিয় ভূমিকার দিকে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন ব্রিটেনের মতো একই পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যেই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে নীতিগত ব্যবধান আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
ব্রিটেনের অতীতও এই বিতর্কের অংশ
ফিলিস্তিন প্রশ্নে ব্রিটেনের বর্তমান অবস্থানকে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আরবদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি, একই সময়ে ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠায় সমর্থন, ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের নীতি এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৪৮ সালের বিভাজন ও যুদ্ধ—এসব ঘটনাই ব্রিটিশ নীতির উত্তরাধিকারকে জটিল করেছে।
ফিলিস্তিনিদের কাছে তাই ব্রিটেন কেবল একটি বর্তমান পশ্চিমা রাষ্ট্র নয়; তাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও। ফলে আজকের নিষেধাজ্ঞা যতটা বর্তমান নীতির প্রশ্ন, ততটাই অতীতের দায় ও ব্যর্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ কারণেই নতুন নীতিকে শুধু মানবাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এটি একই সঙ্গে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা। প্রশ্ন হচ্ছে, লন্ডন কি এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে পারবে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক—তিনটিকে একই কাঠামোর মধ্যে রাখা সম্ভব হবে?
কথা থেকে প্রয়োগের পরীক্ষায়
ব্রিটেনের পদক্ষেপের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন শুরু। পণ্য শনাক্ত করা, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বাজারের পণ্য ও অধিকৃত বসতির পণ্যের পার্থক্য নির্ধারণ করা এবং বসতি-সংশ্লিষ্ট পরিষেবা ও অর্থায়নের প্রকৃত যোগসূত্র বের করা সহজ কাজ নয়। ভুল প্রয়োগ হলে নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তাই এই সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন এখনই করা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ভাষ্যের সঙ্গে বাস্তব নীতির যে ব্যবধান ছিল, ব্রিটেন সেটি কমানোর চেষ্টা করছে। এর অর্থনৈতিক আঘাত হয়তো সীমিত, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতিতে এর রাজনৈতিক সংকেত বড় হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে শুধু লন্ডনের ওপর নয়। ফ্রান্স, কানাডাসহ অন্য দেশগুলো একই পথে কতটা এগোয়, ইউরোপীয় দেশগুলো কী ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা নেয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে বসতি সম্প্রসারণের প্রশ্নে অবস্থান নেয়—এসবই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
ব্রিটেনের ঘোষণাকে তাই চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখার কারণ নেই। এটি বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় নীতির ভাষা থেকে বাস্তব পদক্ষেপে যাওয়ার পরীক্ষা। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে যে বসতি সম্প্রসারণ থামেনি, কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা তা একদিনে বদলে দেবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনকে বাস্তব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা যদি ধারাবাহিক হয়, তাহলে এই পদক্ষেপ একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
মাইকেল জ্যানসেন 


















