পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বোন আলিমা খানকে লাহোরে আটক করেছে পুলিশ। রোববার তাকে জনশৃঙ্খলা রক্ষা আইনের (এমপিও) ৩ ধারায় আটক করা হয় বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পরে তাকে কোট লাখপাত কারাগারে নেওয়া হয়েছে।
পিটিআইয়ের দলীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, লাহোরের আপার মলে নিজের বাসা থেকে জিমে যাওয়ার জন্য বের হওয়ার সময় আলিমা খানকে আটক করা হয়। লিটন রোড থানার পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। তার গাড়িটি পরে ওই থানায় রাখা হয়।
আলিমার আরেক বোন নোরিন নিয়াজি জানান, বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ই তাকে আটক করা হয়েছে। পরে তিনি খবর পান, আলিমাকে কোট লাখপাত কারাগারে নেওয়া হয়েছে।
আলিমা খানকে আটকের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নোরিন বলেন, নারীদেরও কেন আটক করা হচ্ছে, তা তারা বুঝতে পারছেন না। তবে এমন পদক্ষেপে তারা ভয় পাচ্ছেন না এবং ইমরান খানের জন্য তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

পিটিআই চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গোহর আলী খানও আলিমা খানের আটকের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আলিমাকে আটক বা হেফাজতে রাখা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
গোহর বলেন, পিটিআই শুরু থেকেই স্পষ্ট করে আসছে যে তাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক হবে। দলের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দাবিগুলো শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই আদায় করতে চায় তারা। কোনো ধরনের সংঘাত বা সহিংসতা পিটিআই চায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আলিমা খানকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে গোহর বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দলীয় কৌশল শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এরই মধ্যে পিটিআইয়ের আরও কয়েকজন নেতা ও আইনপ্রণেতাকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন গোহর। তিনি জানান, দলের সদস্যরা সাইফুল্লাহ নিয়াজি, সানাউল্লাহ মাস্তিখেল, দাওয়ার কুন্দি, মিয়ান গাউস ও আহসান জামাল খানকে আটকের খবর দিয়েছেন।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা নিয়েও অচলাবস্থা
আলিমা খানকে আটকের আগে সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়েও কথা বলেন ব্যারিস্টার গোহর। তিনি জানান, আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে পিটিআই, কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক পরিবেশ এতটাই শীতল যে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।
পেশোয়ারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় গোহর বলেন, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। এ জন্য সব পক্ষকেই কিছুটা পিছিয়ে এসে সমঝোতার পথ তৈরি করতে হবে।
ইমরান খানের মুক্তি এবং সংবিধানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার দাবিতে পিটিআই আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও ইসলামাবাদমুখী মার্চের ঘোষণা দিয়েছে।

এই কর্মসূচি ঘিরে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। এর এক দিন আগে সিনেটের বিরোধীদলীয় নেতা ও তেহরিক তাহাফফুজ-এ-আইন-ই-পাকিস্তানের (টিটিএপি) ভাইস চেয়ারম্যান আল্লামা রাজা নাসির আব্বাস জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
আব্বাসের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বিরোধী পক্ষ তাদের অবস্থান তুলে ধরেছে। তাকে জানানো হয়েছে, ২৭ সেপ্টেম্বরের মার্চ স্থগিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র ইমরান খানের।
মহসিন নকভির সঙ্গে বৈঠক হয়েছে কি না—এ বিষয়ে গোহর তা অস্বীকার করেননি। বরং তিনি জানান, বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও বৈঠক অব্যাহত রয়েছে।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় পুলিশ নিয়ে আলোচনা
খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান গোহর। তার দাবি, গত বছর প্রদেশটি পুলিশ বিভাগের জন্য ৪৫ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি ব্যয় করেছে।
তিনি বলেন, পুলিশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না। প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীর হাতে পুলিশের ওপর যে ক্ষমতা রয়েছে, তা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে ব্যবহার করা হবে না; বরং পুলিশের উন্নয়নে তা কাজে লাগানো হবে।

২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন গোহর।
পিটিআইয়ের পরিকল্পিত মার্চ নিয়ে করা এক আবেদনের শুনানিতে আদালত প্রাদেশিক সরকারগুলোকে নির্দেশ দেন, যাতে সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে কেউ ইসলামাবাদমুখী কোনো বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সুযোগ না পায়। একই সঙ্গে কোনো সরকারি কর্মচারীকে এমন কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য না করার নির্দেশও দেওয়া হয়।
এরপর শনিবার খাইবার পাখতুনখোয়ার পুলিশের মহাপরিদর্শক জুলফিকার হামিদ পুলিশ কর্মকর্তাদের ইসলামাবাদমুখী কোনো মার্চ, সমাবেশ বা মিছিলকে সহযোগিতা না করার নির্দেশ দেন।
তবে গোহর বলেন, এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যাতে খাইবার পাখতুনখোয়ার সাধারণ মানুষ ও পুলিশ পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়।
তিনি আশ্বস্ত করেন, পিটিআই তাদের আন্দোলনের সময় কোনো আইন ভঙ্গ করবে না এবং সড়কও অবরোধ করবে না। একই সঙ্গে ইসলামাবাদমুখী কর্মসূচিতে সরকারি সম্পদ ব্যবহার করা হবে না বলেও তিনি জানান।
আলিমা খানকে আটক, পিটিআই নেতাদের আরও কয়েকজনকে হেফাজতে নেওয়ার দাবি এবং ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে আদালতের নির্দেশ—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনাও অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















