ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দুই পক্ষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটিকে সবচেয়ে বড় উত্তেজনাপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ঘোষণার ফলে লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি বলেন, ইয়েমেনের ওপর আরোপিত “অন্যায় ও নিপীড়নমূলক অবরোধের” জবাব হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, “চোখের বদলে চোখ” নীতির ভিত্তিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে যেকোনো “বেপরোয়া পদক্ষেপের” জবাবে হুথিরা ব্যাপক ও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া
হুথিদের ঘোষণার পর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ পদক্ষেপের নিন্দা জানায়। সৌদি কর্তৃপক্ষ হুথিদের “সন্ত্রাসী মিলিশিয়া” হিসেবে উল্লেখ করে জানায়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিজেদের জাহাজ ও সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিমানবন্দর হামলার পর নতুন উত্তেজনা
নৌ অবরোধ ঘোষণার এক সপ্তাহ আগে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের অনুগত বাহিনী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালায়। হুথিদের দাবি, তেহরান থেকে একটি ইরানি বিমানে করে ফেরত আসা তাদের প্রতিনিধিদলকে অবতরণে বাধা দিতেই এই হামলা চালানো হয়েছিল।
এই ঘটনার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং সর্বশেষ নৌ অবরোধ ঘোষণার মাধ্যমে তা নতুন পর্যায়ে পৌঁছায়।
দীর্ঘদিনের সংঘাত
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের মাধ্যমে হুথিরা দেশটির গৃহযুদ্ধে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। পরের বছর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক অভিযান শুরু হয়।
তবে দীর্ঘ বিমান হামলা সত্ত্বেও হুথিদের ক্ষমতা ভাঙা যায়নি। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সৌদি নেতৃত্বাধীন বোমা হামলার সমালোচনা করে জানায়, এতে ইয়েমেনের মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
অন্যদিকে, হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়।
আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগ
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর হুথিরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশের অংশ হিসেবে লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে হামলা শুরু করে। ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও হুথিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এসব হামলা অনেকটাই কমে আসে।
লোহিত সাগর সুয়েজ খালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালীর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ।
এদিকে হুথিদের এই নতুন ঘোষণার সময় হরমুজ প্রণালীও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চলমান সংঘাতের কারণে বন্ধ রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটকে ঘিরে একসঙ্গে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
হুথিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক নৌ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















