সিরিয়ায় প্রায় ১৪ বছরের যুদ্ধ মানুষের জীবনে রেখে গেছে গভীর ক্ষত, ধ্বংস আর অসংখ্য শোকের স্মৃতি। বোমার শব্দ, ধ্বংসস্তূপ, উদ্বাস্তু শিবির এবং নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষাই দীর্ঘদিন দেশটির বাস্তবতার প্রতীক হয়ে ছিল। কিন্তু আসাদ সরকারের পতনের পর দেশটির কিছু এলাকায় ধীরে ধীরে ফিরে আসছে এমন এক দৃশ্য, যা একসময় প্রায় অসম্ভব বলে মনে হতো—স্বাভাবিক জীবন।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে সিরিয়ায় ফিরে এসে আলেপ্পোর পুরোনো শহরের আল-হাতাব চত্বরে এমনই এক দৃশ্য দেখা যায়। কয়েকজন শিশু সেখানে ফুটবল খেলছিল। একজনের লাথিতে বলটি রাস্তায় গিয়ে একটি গাড়িতে ধাক্কা খায়। শিশুরা চিৎকার করে হাসতে হাসতে আবার খেলায় ফিরে যায়। দৃশ্যটি ছিল একেবারেই সাধারণ। কিন্তু সিরিয়ার বাস্তবতায় এই সাধারণ দৃশ্যই যেন এক ধরনের অলৌকিক ঘটনা।
কয়েক বছর আগে চত্বরটি নতুন করে প্রশস্ত সাদা চুনাপাথরের স্ল্যাব দিয়ে বাঁধানো হয়েছে। চারপাশে রয়েছে যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত ভবন এবং নতুন কিছু দোকানপাট। প্রায় ১৪ বছরের সংঘাত ও ব্যর্থ পুনর্গঠনের চিহ্ন এখনো স্পষ্ট। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের ভয়াবহ সময়ে আল-হাতাব চত্বর ছিল আলেপ্পোতে সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার মধ্যকার এক ধরনের বিভাজনরেখা। দুই পক্ষের মাঝখান দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
সরকারি বাহিনীর বিমান হামলা এবং বিদ্রোহীদের ভূগর্ভস্থ বিস্ফোরণে জদেইদেহ এলাকার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। ঐতিহাসিক এই এলাকা ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। যুদ্ধের সময় ধ্বংসের পর ধোঁয়ার স্তম্ভ, ধ্বংসস্তূপ থেকে ছাইয়ে ঢাকা মানুষকে উদ্ধার করতে ছুটে যাওয়া স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকর্মী এবং চারপাশের ভাঙাচোরা দৃশ্য ছিল নিত্যদিনের চিত্র। অথচ সেই একই জায়গায় এখন শিশুরা ফুটবল খেলছে।

এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি ভিডিওর কথা। ভিডিওটিতে একটি বোমা পড়ার পরের দৃশ্য থেকে সময়কে উল্টো দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, বোমাটি আকাশে ফিরে যাচ্ছে এবং নিচে একটি চত্বরে শিশুরা ফুটবল খেলছে। তখন সেটি ছিল কল্পনা। এখন বাস্তব সিরিয়ায় এমন দৃশ্য সত্যিই দেখা যাচ্ছে।
তবে ধ্বংসের স্মৃতি এখনো চারপাশে ছড়িয়ে আছে। চত্বরের পুরোনো গাছের টবগুলো আর নেই। বহু বছরের পুরোনো রুপা ও সোনার দোকানও হারিয়ে গেছে। একসময় যে জায়গা ছিল ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত, এখন সেখানে অনেকটা ফাঁকা ও অচেনা অনুভূতি তৈরি হয়।
আসাদ সরকারের পতনের পর এটি ছিল আলেপ্পোতে চতুর্থ সফর। প্রতিবারই সেখানে শোক, ক্ষোভ, আনন্দ, কৃতজ্ঞতা, অবিশ্বাস এবং হারানোর অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করেছে। সময়ের সঙ্গে সেই আবেগ কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। তার জায়গায় জন্ম নিয়েছে নতুন এক প্রশ্ন—সিরিয়া কি এবার সত্যিই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে?
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের অভিজ্ঞতা অবশ্য এক নয়। আসাদ সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর কেউ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য নিয়ে অভিযোগ করছেন। কেউ মনে করছেন বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে। আবার কেউ নতুন অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে পুরোপুরি সমর্থন করছেন। হতাশা ও আশাবাদের মাঝখানেই সম্ভবত সিরিয়ার বর্তমান বাস্তবতা অবস্থান করছে।
তারপরও দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তনের কিছু স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। দামেস্কের পুরোনো শহরের সরু রাস্তাগুলোতে মানুষ কেনাকাটায় ব্যস্ত। ক্যাফেগুলোতে রাতভর বসে সিরীয়রা বিশ্বকাপের খেলা দেখছেন। দামেস্কের একটি সরকারি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে শিশুরা রোলার স্কেটিং করছে এবং কারাতে শিখছে। যে জায়গায় একসময় রুশ ও ইরানি বাহিনী অবস্থান করেছিল, সেই জায়গাই এখন সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত। এসব কার্যক্রম বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
আলেপ্পোর দুর্গেও স্বাভাবিক জীবনের এই প্রত্যাবর্তনের আরেকটি ছবি দেখা গেছে। এক সন্ধ্যায় সেখানে অ্যাম্ফিথিয়েটারে সংগীত পরিবেশনা দেখতে জড়ো হয়েছিলেন ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষ। সিরীয় নারীদের সংগীতদল গার্ডেনিয়া কয়ার ১৯৮০-এর দশকে বেড়ে ওঠা সিরীয় শিশুদের পরিচিত গান পরিবেশন করে। আলেপ্পোর একজন ঐতিহ্যবাহী শিল্পী পরিবেশন করেন কুদুদ হালাবিয়া ও মুওয়াশশাহাত—শত শত বছর ধরে গাওয়া আন্দালুসীয় কবিতাভিত্তিক গান।
দর্শকেরা গান গাইতে গাইতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাচতে শুরু করেন। এমনকি নিরাপত্তারক্ষীরাও সেই আনন্দে যোগ দেন। সন্ধ্যা নামার পর আকাশে আতশবাজি ফুটতে থাকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য যুদ্ধের পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসে। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে স্বভাবতই আতঙ্কিত হয়ে উঠলেও পরে বোঝা যায়, এবার আকাশ থেকে মৃত্যু নেমে আসেনি। আতশবাজির আলোয় মানুষ ভয় নয়, আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে।
সিরিয়ায় সত্যিকারের আনন্দ অনুভব করা তাই ছোট কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এই স্বাভাবিকতা এখনো ভঙ্গুর এবং সবার জীবনে সমানভাবে ফিরে আসেনি।
দামেস্কেই জুলাই মাসের এক সপ্তাহে দুটি বিস্ফোরণ সেই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। প্রথম বিস্ফোরণে আদালতের বাইরে একটি ক্যাফে লক্ষ্যবস্তু হয় এবং নয়জন নিহত হন। নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন আইনজীবী। কয়েক দিন পর ফোর সিজনস হোটেলের কাছে দুটি বিস্ফোরণে ১৮ জন আহত হন। ওই সময় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দামেস্কে সফর করছিলেন। ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, সিরিয়ায় স্বাভাবিক জীবন ফিরলেও সহিংসতার ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
এর মধ্যেই আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তী সংসদ প্রথম অধিবেশন শুরু করে। তবে সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক সিরীয়র সমালোচনা রয়েছে। সংসদের এক-তৃতীয়াংশ সদস্য প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করেছেন। বাকিদের আঞ্চলিক নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে বেছে নেওয়া হয়েছে, আর এসব নির্বাচকমণ্ডলীর নেতৃত্বে থাকা কমিটিগুলোও প্রেসিডেন্টের নিয়োগ করা।
তারপরও নতুন সংসদের পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে। আসাদ আমলে সরকারের সঙ্গে মতবিরোধের প্রকাশ্য কোনো জায়গা ছিল না; ভিন্নমতের জন্য জীবনও বিপন্ন হতে পারত। অতীতে সংসদে এমন চরম আনুগত্যের নজির ছিল, যখন এক সদস্য বলেছিলেন, বাশার আল-আসাদ শুধু সিরিয়াই নয়, গোটা মহাবিশ্ব শাসন করবেন—যে সময় আসাদ সরকার নিজ দেশের মানুষের ওপর ব্যারেল বোমা ফেলছিল।
নতুন সংসদে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা সংসদে প্রবেশ করেন নীরবে এবং আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। বক্তব্যের প্রতিটি বাক্যের পর আগের মতো পরিকল্পিত হাততালি শোনা যায়নি। বরং কোনো হাততালিই ছিল না। ছোট মনে হলেও এই পরিবর্তন সিরিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করে।
পরিবর্তন শুধু মানুষ কী করতে পারছে, তা নিয়ে নয়; মানুষ কী বলতে পারছে, সেটিও বদলে গেছে। আসাদ পরিবারের দীর্ঘ শাসনামলে যে ভয় ও নীরবতা সিরিয়ার সমাজকে ঘিরে রেখেছিল, তা অনেকটাই সরে গেছে। মানুষ এখন অতীতের ভয়াবহ ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারছে।

হামা শহরে একটি ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পীর কর্মশালায় বসে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারির ঘটনা নিয়ে কথা বলা হয়েছে। ওই সময় হাফেজ আল-আসাদের বাহিনী বিদ্রোহী হামা শহর অবরোধ করেছিল এবং এক মাসে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। দোকানে থাকা অন্যরাও নিজেদের পরিবারের সদস্যদের ঘরে নিহত হওয়ার গল্প বলেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—এসব কথা বলা হচ্ছিল হামা শহরেই, প্রকাশ্যে, কোনো ভয় ছাড়াই।
আলেপ্পোতেও এক ব্যক্তি নৈশভোজের সময় স্বাভাবিকভাবেই নিজের ও স্ত্রীর অতীতের কথা বলেছেন। দুজনেই আসাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কারাগারে ছিলেন। তাদের বেঁচে থাকা এবং সেই ভয়াবহ অতীত নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারা—দুটিই নতুন সিরিয়ার বড় পরিবর্তনের প্রতীক।
তবে সিরিয়ার ক্ষত এখনো অনেক গভীর। হামার ক্ষত ৪৪ বছরের পুরোনো। শহরের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে ক্ষতির শিকার। আর আলেপ্পো, দামেস্কের উপকণ্ঠসহ দেশের বহু এলাকায় গত ১৪ বছরের যুদ্ধের মানসিক ও সামাজিক ক্ষত এখনো স্পষ্ট।
আসাদ সরকারের সময় নিখোঁজ হওয়া এক লাখেরও বেশি মানুষের পরিবারের অনেকেই এখনো প্রিয়জনের ভাগ্য সম্পর্কে কোনো উত্তর পাননি। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও তাদের জন্য অপেক্ষা শেষ হয়নি।
এর পাশাপাশি নতুন সিরিয়াতেও তৈরি হয়েছে নতুন ক্ষত। গত বছর দেশটির উপকূলীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ সিরিয়ায় সরকার এবং সশস্ত্র মিলিশিয়াদের মধ্যে সংঘর্ষে আলাউই ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের বহু মানুষ নিহত হয়েছেন এবং অনেকে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। এই সম্প্রদায়গুলো সিরিয়ার আশাবাদী ভবিষ্যতের পথে কোনো বাধা নয়। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার প্রতিষ্ঠাই বরং প্রমাণ করবে নতুন সিরিয়ার সেই আশাবাদ কতটা বাস্তব।
কেবল কিছু মানুষের জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে আসাকে অন্যদের নতুন দুর্ভোগ উপেক্ষা করার অজুহাত বানানো যাবে না। যুদ্ধের পর একটি দেশ কীভাবে সামনে এগিয়ে যাবে, তার সহজ কোনো উত্তর নেই। বসনিয়াতেও স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডের ৩১ বছর পর এখনো নিহতদের পরিচয় শনাক্ত ও মরদেহ দাফনের কাজ চলছে। সিরিয়াও এখনো সেই দীর্ঘ হিসাব-নিকাশের একেবারে শুরুতে।

দেশটির জন্য প্রয়োজন ন্যায়বিচার, স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নিহত ও নিখোঁজ মানুষদের প্রতি সম্মান জানানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে প্রয়োজন এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে মানুষ আর বিস্ফোরণের শব্দকে মৃত্যুর সংকেত হিসেবে দেখবে না।
হয়তো একদিন আল-হাতাব চত্বরের সাদা পাথরগুলোও পুরোনো হয়ে পাশের ধূসর পাথরের সঙ্গে মিশে যাবে। তখন আজকের সময়টিও ইতিহাস হয়ে উঠবে। হয়তো সেদিন সিরিয়ার মানুষ আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসাকে অবিশ্বাস্য বলে মনে করবে না।
এখনো সেই দিন আসেনি। কিন্তু আজ মানুষ আকাশে আগুনের রঙ দেখে আতঙ্কে নয়, আনন্দে তাকাচ্ছে। আলেপ্পোর যে চত্বর একসময় যুদ্ধক্ষেত্র ছিল, সেখানে শিশুরা ফুটবল খেলছে এবং নতুন আনন্দের স্মৃতি তৈরি করছে।
সিরিয়ার জন্য হয়তো এটুকুই অগ্রগতির সবচেয়ে মানবিক ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















