১০:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন এশিয়ার আর্থিক সংকট ডেকে না আনে

নেপালের ভয়াবহ বন্যা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি শুধু মানুষের জীবনহানি কিংবা ঘরবাড়ি ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি দেশের অর্থনীতির ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই দুর্যোগের পর মানুষের জীবন রক্ষা ও জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও সামনে রাখতে হবে—এই বিপর্যয় কীভাবে খাদ্য, মূল্যস্ফীতি, সরকারি অর্থব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে আঘাত করবে?

প্রতিটি দুর্যোগের কারণ এক নয়। ফলে কোনো নির্দিষ্ট বন্যা বা খরাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা এল নিনোর ফল বলা যথাযথ নয়। তবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস বলছে, আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব বাড়তে পারে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়ার পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের ধরনেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনোর সঙ্গে সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়া, খরা, দাবানল ও ধোঁয়াশার ঝুঁকি বাড়ে। অবশ্য এর প্রভাব দেশ ও ঋতুভেদে ভিন্ন হতে পারে।

এ বাস্তবতায় দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিকে শুধু ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের অর্থনৈতিক অভিঘাত প্রায়ই একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

দুর্যোগের অর্থনৈতিক চক্র

বন্যা, খরা কিংবা তীব্র তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে এবং একই সঙ্গে রাস্তা, বন্দর, বিদ্যুৎ ও সেচ অবকাঠামোর ক্ষতি করতে পারে। কোনো দেশের খাদ্য মজুত দুর্বল হলে বা কয়েকটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর আমদানিনির্ভরতা বেশি থাকলে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার পরপরই বাজারে সরবরাহের সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফল হয় খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস।

সরকার তখন ভর্তুকি বাড়ানো কিংবা জরুরি আমদানির ব্যবস্থা করার চাপে পড়ে। কিন্তু এই পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও সহজ নয়। একদিকে সরবরাহ সংকট মূল্যস্ফীতি বাড়ায়, অন্যদিকে দুর্যোগ মানুষের আয় ও ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতিকে দুর্বল করে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা কঠিন হয়ে ওঠে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, সেতু, বন্দর, হাসপাতাল, স্কুল কিংবা সেচব্যবস্থা দ্রুত পুনর্গঠন করা না গেলে সাময়িক দুর্যোগ দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতার ক্ষতিতে পরিণত হতে পারে। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নিতে হয়, সরকারকে জরুরি ঋণ করতে হয় অথবা বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।

এই পর্যায়ে একটি দুর্যোগ শুধু মানবিক বিপর্যয় থাকে না; তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘস্থায়ী বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

আগেই অর্থের ব্যবস্থা রাখা জরুরি

বড় ধরনের দুর্যোগের সম্পূর্ণ ক্ষতি কোনো বীমা কিংবা আগাম অর্থায়ন ব্যবস্থায় পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সংকটের প্রথম পর্যায়ে দ্রুত অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকলে পুনরুদ্ধারের গতি অনেক বাড়ানো যায়। দুর্যোগের পর সরকারি অর্থের ব্যবস্থা করতে দীর্ঘ সময় লেগে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ যেমন বাড়ে, তেমনি অর্থনীতির ক্ষতিও দীর্ঘায়িত হয়।

এই কারণে দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়নকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ করা জরুরি। মে মাসে আসিয়ান প্লাস থ্রি—অর্থাৎ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া—অঞ্চলের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা ২০২৬-২৮ সময়ের দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন উদ্যোগের রোডম্যাপ অনুমোদন করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো সদস্য দেশগুলোর জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন কৌশল শক্তিশালী করা এবং বীমা, দুর্যোগ বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো।

এর কার্যকারিতার একটি উদাহরণ লাওস। ১ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দুর্যোগ ঝুঁকি বীমা সুবিধা লাওসকে ১০ লাখ ডলার দেয়। ভারী বৃষ্টিপাত ও ব্যাপক বন্যায় ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সরকারি তথ্য পাওয়ার পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যেই এই অর্থ দেওয়া হয়। দুর্যোগের পর এমন দ্রুত অর্থপ্রবাহ জরুরি সেবা চালু রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সব দুর্যোগের জন্য একই ধরনের অর্থায়ন প্রয়োজন নেই। ছোট ও ঘন ঘন ঘটতে পারে এমন ক্ষতির ক্ষেত্রে সরকারি জরুরি তহবিল বা বাজেটের সংরক্ষিত অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে। মাঝারি মাত্রার দুর্যোগে শর্তসাপেক্ষ ঋণ কার্যকর হতে পারে। আর বিরল কিন্তু ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে বীমা ও পুঁজিবাজারভিত্তিক ব্যবস্থা বেশি উপযোগী।

অর্থাৎ ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী অর্থের উৎস নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও জরুরি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এমন হতে হবে, যাতে অর্থ বরাদ্দ হওয়ার পর তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়।Nepal says big polluters must 'wake up' as it calls for climate  compensation over flood disaster | Nepal-Tibet flood disaster | The Guardian

সরকারের আর্থিক সক্ষমতাই শেষ কথা নয়

আগাম অর্থায়নের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, দুর্যোগের পর সরকারকে হঠাৎ করে কর বাড়ানো, উন্নয়ন ব্যয় কমানো কিংবা উচ্চ ব্যয়ে জরুরি ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কমে যায়। এতে সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তাও কমে।

এর প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়ে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক বাজার যদি জানে যে দুর্যোগের পর সরকার কীভাবে অর্থায়ন করবে, তাহলে কর, সরকারি বিনিয়োগ, অর্থপ্রদান ও ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা কমে। দ্রুত বন্দর, সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা গেলে সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপও সীমিত রাখা সম্ভব।

এশিয়ার জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অঞ্চলটির অর্থনীতিগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একটি দেশের বন্দর বা উৎপাদনব্যবস্থা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব সহজেই প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর পড়ে। বিপরীতে দ্রুত পুনরুদ্ধার শুধু ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির অর্থনীতিকেই রক্ষা করে না; আঞ্চলিক বাণিজ্য ও উৎপাদনব্যবস্থাকেও স্থিতিশীল রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়নের গুরুত্ব তাই আগের চেয়ে অনেক বেশি। এটি এখন আর দুর্যোগের পরে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার একটি সীমিত ব্যবস্থা নয়। সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা গেলে এটি সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার সুরক্ষা দিতে পারে।

আসিয়ান প্লাস থ্রি দেশগুলো মুদ্রা ও আর্থিক সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় একই ধরনের দূরদর্শিতা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও প্রয়োজন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগের অভিঘাত যেন মানবিক সংকট থেকে রাজস্ব সংকট, সেখান থেকে আর্থিক অস্থিরতায় রূপ না নেয়—তা নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য দুর্যোগ আঘাত হানার পর অর্থের সন্ধান না করে আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

একটি উষ্ণতর বিশ্বে স্থিতিস্থাপকতার প্রকৃত অর্থ হলো শুধু ধ্বংসের পর পুনর্গঠন নয়; বরং বিপর্যয়ের অর্থনৈতিক পরিণতি আগেই হিসাব করে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরো অর্থনীতিকে সংকটে ঠেলে দিতে না পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন এশিয়ার আর্থিক সংকট ডেকে না আনে

১০:০০:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপালের ভয়াবহ বন্যা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি শুধু মানুষের জীবনহানি কিংবা ঘরবাড়ি ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি দেশের অর্থনীতির ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই দুর্যোগের পর মানুষের জীবন রক্ষা ও জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও সামনে রাখতে হবে—এই বিপর্যয় কীভাবে খাদ্য, মূল্যস্ফীতি, সরকারি অর্থব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে আঘাত করবে?

প্রতিটি দুর্যোগের কারণ এক নয়। ফলে কোনো নির্দিষ্ট বন্যা বা খরাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা এল নিনোর ফল বলা যথাযথ নয়। তবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস বলছে, আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব বাড়তে পারে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়ার পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের ধরনেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনোর সঙ্গে সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়া, খরা, দাবানল ও ধোঁয়াশার ঝুঁকি বাড়ে। অবশ্য এর প্রভাব দেশ ও ঋতুভেদে ভিন্ন হতে পারে।

এ বাস্তবতায় দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিকে শুধু ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের অর্থনৈতিক অভিঘাত প্রায়ই একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

দুর্যোগের অর্থনৈতিক চক্র

বন্যা, খরা কিংবা তীব্র তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে এবং একই সঙ্গে রাস্তা, বন্দর, বিদ্যুৎ ও সেচ অবকাঠামোর ক্ষতি করতে পারে। কোনো দেশের খাদ্য মজুত দুর্বল হলে বা কয়েকটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর আমদানিনির্ভরতা বেশি থাকলে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার পরপরই বাজারে সরবরাহের সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফল হয় খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস।

সরকার তখন ভর্তুকি বাড়ানো কিংবা জরুরি আমদানির ব্যবস্থা করার চাপে পড়ে। কিন্তু এই পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও সহজ নয়। একদিকে সরবরাহ সংকট মূল্যস্ফীতি বাড়ায়, অন্যদিকে দুর্যোগ মানুষের আয় ও ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতিকে দুর্বল করে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা কঠিন হয়ে ওঠে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, সেতু, বন্দর, হাসপাতাল, স্কুল কিংবা সেচব্যবস্থা দ্রুত পুনর্গঠন করা না গেলে সাময়িক দুর্যোগ দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতার ক্ষতিতে পরিণত হতে পারে। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নিতে হয়, সরকারকে জরুরি ঋণ করতে হয় অথবা বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।

এই পর্যায়ে একটি দুর্যোগ শুধু মানবিক বিপর্যয় থাকে না; তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘস্থায়ী বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

আগেই অর্থের ব্যবস্থা রাখা জরুরি

বড় ধরনের দুর্যোগের সম্পূর্ণ ক্ষতি কোনো বীমা কিংবা আগাম অর্থায়ন ব্যবস্থায় পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সংকটের প্রথম পর্যায়ে দ্রুত অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকলে পুনরুদ্ধারের গতি অনেক বাড়ানো যায়। দুর্যোগের পর সরকারি অর্থের ব্যবস্থা করতে দীর্ঘ সময় লেগে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ যেমন বাড়ে, তেমনি অর্থনীতির ক্ষতিও দীর্ঘায়িত হয়।

এই কারণে দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়নকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ করা জরুরি। মে মাসে আসিয়ান প্লাস থ্রি—অর্থাৎ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া—অঞ্চলের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা ২০২৬-২৮ সময়ের দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন উদ্যোগের রোডম্যাপ অনুমোদন করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো সদস্য দেশগুলোর জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন কৌশল শক্তিশালী করা এবং বীমা, দুর্যোগ বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো।

এর কার্যকারিতার একটি উদাহরণ লাওস। ১ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দুর্যোগ ঝুঁকি বীমা সুবিধা লাওসকে ১০ লাখ ডলার দেয়। ভারী বৃষ্টিপাত ও ব্যাপক বন্যায় ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সরকারি তথ্য পাওয়ার পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যেই এই অর্থ দেওয়া হয়। দুর্যোগের পর এমন দ্রুত অর্থপ্রবাহ জরুরি সেবা চালু রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সব দুর্যোগের জন্য একই ধরনের অর্থায়ন প্রয়োজন নেই। ছোট ও ঘন ঘন ঘটতে পারে এমন ক্ষতির ক্ষেত্রে সরকারি জরুরি তহবিল বা বাজেটের সংরক্ষিত অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে। মাঝারি মাত্রার দুর্যোগে শর্তসাপেক্ষ ঋণ কার্যকর হতে পারে। আর বিরল কিন্তু ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে বীমা ও পুঁজিবাজারভিত্তিক ব্যবস্থা বেশি উপযোগী।

অর্থাৎ ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী অর্থের উৎস নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও জরুরি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এমন হতে হবে, যাতে অর্থ বরাদ্দ হওয়ার পর তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়।Nepal says big polluters must 'wake up' as it calls for climate  compensation over flood disaster | Nepal-Tibet flood disaster | The Guardian

সরকারের আর্থিক সক্ষমতাই শেষ কথা নয়

আগাম অর্থায়নের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, দুর্যোগের পর সরকারকে হঠাৎ করে কর বাড়ানো, উন্নয়ন ব্যয় কমানো কিংবা উচ্চ ব্যয়ে জরুরি ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কমে যায়। এতে সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তাও কমে।

এর প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়ে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক বাজার যদি জানে যে দুর্যোগের পর সরকার কীভাবে অর্থায়ন করবে, তাহলে কর, সরকারি বিনিয়োগ, অর্থপ্রদান ও ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা কমে। দ্রুত বন্দর, সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা গেলে সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপও সীমিত রাখা সম্ভব।

এশিয়ার জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অঞ্চলটির অর্থনীতিগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একটি দেশের বন্দর বা উৎপাদনব্যবস্থা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব সহজেই প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর পড়ে। বিপরীতে দ্রুত পুনরুদ্ধার শুধু ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির অর্থনীতিকেই রক্ষা করে না; আঞ্চলিক বাণিজ্য ও উৎপাদনব্যবস্থাকেও স্থিতিশীল রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়নের গুরুত্ব তাই আগের চেয়ে অনেক বেশি। এটি এখন আর দুর্যোগের পরে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার একটি সীমিত ব্যবস্থা নয়। সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা গেলে এটি সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার সুরক্ষা দিতে পারে।

আসিয়ান প্লাস থ্রি দেশগুলো মুদ্রা ও আর্থিক সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় একই ধরনের দূরদর্শিতা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও প্রয়োজন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগের অভিঘাত যেন মানবিক সংকট থেকে রাজস্ব সংকট, সেখান থেকে আর্থিক অস্থিরতায় রূপ না নেয়—তা নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য দুর্যোগ আঘাত হানার পর অর্থের সন্ধান না করে আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

একটি উষ্ণতর বিশ্বে স্থিতিস্থাপকতার প্রকৃত অর্থ হলো শুধু ধ্বংসের পর পুনর্গঠন নয়; বরং বিপর্যয়ের অর্থনৈতিক পরিণতি আগেই হিসাব করে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরো অর্থনীতিকে সংকটে ঠেলে দিতে না পারে।