নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস যেন একের পর এক আন্দোলন, বিদ্রোহ ও ক্ষমতার পালাবদলের দীর্ঘ কাহিনি। স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, দুঃশাসন, স্বজনপ্রীতি, দলীয় আধিপত্য এবং সাধারণ মানুষের মর্যাদাকে উপেক্ষা করার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই বারবার রাজপথে নেমেছে জনগণ। প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসেছে নতুন ব্যবস্থা, নতুন সংবিধান কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন পরীক্ষা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে একটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—নেপালের রাজনৈতিক কাঠামো যতবার বদলেছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি ততবার বদলেছে?
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা রানা শাসনের অবসান থেকে শুরু করে শাহ রাজতন্ত্রের বিভিন্ন পর্যায়, একদলীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, ১৯৯০ সালের সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও বহুদলীয় গণতন্ত্র—নেপাল বহু রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। এরপর মাওবাদী বিদ্রোহ, দীর্ঘ সংঘাত এবং রক্তক্ষয়ের পর দেশ রাজতন্ত্র পেরিয়ে প্রজাতন্ত্রে প্রবেশ করে।
প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে ছিল মানুষের নতুন প্রত্যাশা। কিন্তু প্রায় প্রতিবারই সেই প্রত্যাশার জায়গা নিয়েছে হতাশা।
সবচেয়ে বিস্ফোরক গণঅভ্যুত্থান
সাম্প্রতিক জেনারেশন জেড আন্দোলন নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক বিস্ফোরণ হিসেবে সামনে আসে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আন্দোলন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি দপ্তর, আদালত, মন্ত্রীদের বাসভবন, গণমাধ্যমের ভবন এবং শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি পর্যন্ত হামলা ও অগ্নিসংযোগের লক্ষ্য হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে. পি. শর্মা ওলি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা এবং মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দাহাল প্রচণ্ডের মতো শীর্ষ নেতারাও জনরোষের তীব্রতা থেকে নিরাপদে সরে যেতে বাধ্য হন।
ঘটনাটিকে শুধু রাষ্ট্রীয় ভবন বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ওপর হামলা হিসেবে দেখলে এর গভীর অর্থ বোঝা যাবে না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা রাজনৈতিক ক্ষোভের বিস্ফোরণ। জনগণের একাংশ এমন এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, যে ব্যবস্থাকে তারা নিজেদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ বলে মনে করছিল।
একটি মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, নেপাল হয়তো আবারও তার রাজনৈতিক ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
কিন্তু এরপরই পুরোনো প্রবণতা ফিরে আসে।
ষড়যন্ত্রের ব্যাখ্যায় নিজেদের দায় এড়ানো
নেপালের রাজনৈতিক সমাজে কোনো বড় সংকট দেখা দিলে বিদেশি শক্তির ভূমিকা খোঁজার প্রবণতা নতুন নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্দোলন কিংবা অস্থিরতার পেছনে বাইরের কোনো রাষ্ট্রের পরিকল্পনা রয়েছে—এমন ধারণা খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
শিক্ষিত সমাজ থেকে সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারী—অনেকেই ঘটনার অভ্যন্তরীণ কারণ অনুসন্ধানের আগে বিদেশি ষড়যন্ত্রের ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ডিজিটাল যুগে ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। যাচাই করা তথ্যের চেয়ে সন্দেহ, অনুমান ও ষড়যন্ত্রের গল্প অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
একসময় ভারত ও চীন ছিল এমন সন্দেহের প্রধান লক্ষ্য। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নামও নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় যুক্ত হয়েছে। এতে সবচেয়ে সুবিধা হয় আমাদের নিজেদের। কারণ তখন নিজেদের ভুল, ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলতে হয় না।
কিন্তু বাস্তবতা আরও কঠিন। কোনো বিদেশি শক্তি একটি দেশকে তখনই গভীরভাবে দুর্বল করতে পারে, যখন সেই দেশের অভ্যন্তরে বিভাজন, দুর্নীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বহীন নেতৃত্বের অস্তিত্ব থাকে। বাইরের শক্তি সুযোগ নিতে পারে, কিন্তু সুযোগ তৈরি করে দেয় দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাই।
তাই নেপালের প্রধান বিপদ সীমান্তের ওপারে নয়; বরং রাষ্ট্র ও রাজনীতির ভেতরে।
মানুষ কেন রাজপথে নামে
জেনারেশন জেডের সাম্প্রতিক বিদ্রোহকে বুঝতে হলে প্রথমে জনগণের ক্ষোভের কারণ বুঝতে হবে। এই ক্ষোভের পেছনে কোনো একক বিদেশি শক্তির হাত খোঁজা বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করবে।
দীর্ঘদিন ধরে নেপালের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয় আনুগত্য এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা জমা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোও অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব ধরে রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
সমস্যাটি আরও গভীর। নেপাল বারবার রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলেছে, কিন্তু সেই ব্যবস্থাগুলো পরিচালনাকারী মানুষের রাজনৈতিক মানসিকতা খুব বেশি বদলায়নি।
রাজতন্ত্রের অবসান হয়েছে, প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু জনগণের নামে পরিচালিত নতুন ব্যবস্থায়ও ক্ষমতাবান নেতাদের আচরণ অনেক সময় পুরোনো রাজতান্ত্রিক কর্তৃত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। রাজা নেই, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা নেতাদের চারপাশে ব্যক্তিপূজা, আনুগত্য ও সুবিধাভোগীদের যে বলয় তৈরি হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
সংবিধান বদলালেই কি সমাজ বদলায়?
নেপালের অতীতের বড় আন্দোলনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেগুলোর কিছু অন্তত রাষ্ট্রের কাঠামোয় বাস্তব পরিবর্তন এনেছিল।
মাওবাদী বিদ্রোহের সময় প্রজাতন্ত্র, ফেডারেল ব্যবস্থা ও ধর্মনিরপেক্ষতার মতো দাবিগুলো সামনে এসেছিল। দীর্ঘ সংঘাত ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর নেপাল রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়, ফেডারেল কাঠামো গ্রহণ করে এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে পুনর্গঠন করে।
এই পরিবর্তনগুলো নেপালের জন্য কতটা ইতিবাচক ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় জনগণের প্রকৃত মতামত কতটা প্রতিফলিত হয়েছিল, সেই প্রশ্নও রয়েছে। তবু এটুকু স্বীকার করতেই হবে যে আগের আন্দোলনগুলোর ফলে রাষ্ট্রের কাঠামোয় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক জেনারেশন জেড আন্দোলনের পর সেই মাত্রার পরিবর্তন কোথায়?
একটি সম্ভাবনা, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তব হলো না
আন্দোলনের দ্রুত বিস্তার এবং তীব্রতা দেখে মনে হয়েছিল, এবার হয়তো শুধু সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন হবে না। হয়তো শাসনব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আচরণ এবং নেতৃত্বের জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসবে।
আমি আশা করেছিলাম, এই আন্দোলন নেপালকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাবে যেখানে সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও জনসেবাকে রাজনীতির কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
কিন্তু সেই আশার স্থায়িত্ব খুব বেশি ছিল না।
আন্দোলনের পর সংবিধানে বড় কোনো পরিবর্তন এল না। রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতেও মৌলিক সংস্কার হলো না। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধানের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হলেও, সেই সরকারের গঠন নিয়েও সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল।
ফলে যে আন্দোলনকে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা বলে মনে হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়াই থেমে গেল।
এটাই সবচেয়ে হতাশাজনক দিক।
আবারও একই রাজনৈতিক চক্র
আজ নেপাল আবারও সেই পুরোনো রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। দলীয় আধিপত্য, সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব এবং দুর্বল শাসনের অভিযোগগুলো এখনও অমীমাংসিত।
সমস্যাটি তাই শুধু কোনো একটি সরকার, দল বা নেতার নয়। সমস্যাটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতির। সেই সংস্কৃতিতে ক্ষমতা জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়।
ষড়যন্ত্রের গল্প এই বাস্তবতাকে আরও আড়াল করে। বিদেশি শক্তিকে দায়ী করা সহজ, কিন্তু নিজের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রশ্ন করা কঠিন। বাইরের শত্রুর গল্পে আবেগ আছে; আত্মসমালোচনায় আছে অস্বস্তি ও দায়িত্বের দাবি।
কিন্তু নেপাল যদি সত্যিই বদলাতে চায়, তাহলে সেই অস্বস্তিকর আত্মসমালোচনা থেকে পালানোর সুযোগ নেই।
দেশের মানুষকে প্রশ্ন করতে হবে—কেন একই নেতারা বারবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন? কেন রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে জবাবদিহি এত দুর্বল? কেন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রাজনৈতিক জীবনের স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে? কেন প্রতিটি আন্দোলনের পর মানুষ নতুন আশায় বুক বাঁধে, অথচ কয়েক বছর পর আবারও হতাশ হয়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
পরিবর্তনের আসল লড়াই
নেপালের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন।
সংবিধান পরিবর্তন করা যায়। সরকার পরিবর্তন করা যায়। রাষ্ট্রব্যবস্থার নাম পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, সততা, শৃঙ্খলা এবং ন্যায়বোধ যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে না আসে, তাহলে কোনো ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না।
ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব মানুষকে সাময়িকভাবে স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু কোনো দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। নেপালকে তাই বাইরের শত্রু খোঁজার আগে নিজের ঘরের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে।
নিজেদের নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত পরিবর্তনের পথ তৈরি হতে পারে।
অন্যথায় নেপালের ইতিহাস একইভাবে ফিরে আসবে। জনগণ ক্ষুব্ধ হবে, রাজপথ উত্তাল হবে, পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো কেঁপে উঠবে এবং নতুন আশার জন্ম হবে। কিন্তু কিছুদিন পর সেই আশার জায়গা আবার নেবে হতাশা।
নেপালের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই—মানুষ পরিবর্তনের জন্য বারবার লড়াই করে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে না পারায় শেষ পর্যন্ত আবারও পুরোনো চক্রে ফিরে যায়।
বিপ্লবের আসল সাফল্য তাই সরকার পতনে নয়, মানুষের জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারার মধ্যে। নেপাল সেই পরিবর্তন ঘটাতে না পারলে যত বিপ্লবই আসুক, জনগণের বিশ্বাসঘাতকতার এই ইতিহাস শেষ হবে না।
নারায়ণ প্রসাদ মিশ্র 



















