সাংবিধানিক আদালতের সাম্প্রতিক এক রায় ইন্দোনেশিয়ার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি দরজা খুলে দিয়েছে। সরকারের সমালোচনা বা তাকে ‘অপমান’ করার অভিযোগে শাস্তির বিধান বাতিল করে আদালত শুধু একটি আইনি ধারা সরিয়ে দেয়নি; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহির প্রশ্নটিকেও নতুন করে সামনে এনেছে।
২৮ আগস্টের রায়ে ইন্দোনেশিয়ার সাংবিধানিক আদালত নতুন দণ্ডবিধির ২৪০ ও ২৪১ ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। এই দুই ধারায় সরকারকে অপমান করার জন্য শাস্তির বিধান ছিল। আদালতের সিদ্ধান্ত তাই স্বাভাবিকভাবেই স্বাগত জানানোর মতো। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের মর্যাদা রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় নাগরিকের মুখ বন্ধ করা নয়, বরং সরকারের কাজের মান উন্নত করা।
ইন্দোনেশিয়া অবশ্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি অনেক আগেই দিয়েছে। ২০০৫ সালের আইন নং ১২-এর মাধ্যমে দেশটি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ বা আইসিসিপিআর অনুমোদন করে। এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মানুষ তথ্য খোঁজা, গ্রহণ ও প্রকাশের অধিকার রাখে। এই অধিকারে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হলে তা অবশ্যই আইনি ভিত্তিসম্পন্ন, বৈধ উদ্দেশ্যনির্ভর এবং গণতান্ত্রিক সমাজে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে।
সরকারের সমালোচনা অপরাধ হতে পারে না
সমস্যা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্দোনেশিয়ার আইন প্রণয়নের প্রবণতা অনেক সময় এই নীতির বিপরীত দিকে গেছে। ইলেকট্রনিক তথ্য ও লেনদেন আইন বা আইটিই আইনের সংশোধন, নতুন দণ্ডবিধিতে মানহানির বিস্তৃত বিধান এবং প্রতিবাদের পরিসর সংকুচিত করার নানা উদ্যোগ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমালোচনা থেকে নাগরিকদের নিরুৎসাহিত করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই বাস্তবতায় সাংবিধানিক আদালতের রায়টির গুরুত্ব আরও বেশি। আদালত কার্যত মনে করিয়ে দিয়েছে, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান মানুষের মতো অনুভূতিশীল কোনো ব্যক্তি নয়। তাকে প্রশংসা করা হলো কি না, কেউ তাকে অবজ্ঞা করল কি না কিংবা অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করল কি না—এসব দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের আইনি মর্যাদা নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। সরকারের সুনাম প্রতিষ্ঠিত হবে তার কাজের মধ্য দিয়ে, কারও কারাবাসের মধ্য দিয়ে নয়।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই পরিবর্তনের উদ্যোগ কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে আসেনি। ১২ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর করা আবেদনের ভিত্তিতেই বিষয়টি আদালতে পৌঁছেছে। গণতন্ত্রের সংকটের সময়ে তরুণদের এই ভূমিকা ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসের কথাও মনে করিয়ে দেয়। ১৯৯৮ সালেও শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অনেক সময় অতিরিক্ত স্বাধীনতা বা পশ্চিমা ধারণা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। বাস্তবে এটি গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। নাগরিক যদি সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারেন, তাহলে নীতির ভুল দ্রুত সংশোধনের সুযোগও থাকে না।
একটি সরকারের সিদ্ধান্ত যখন মানুষের জীবিকা, পরিবেশ, শ্রমের অধিকার কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামকে প্রভাবিত করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার থাকা স্বাভাবিক। কোনো জেলে যদি দেখে তার উপকূল দূষিত হচ্ছে, কোনো শ্রমিক যদি মজুরি কমে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়, কিংবা কোনো মা যদি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সংসার চালাতে হিমশিম খান—তাদের প্রতিবাদ সব সময় ভদ্র, একাডেমিক ভাষায় প্রকাশ পাবে, এমন প্রত্যাশা অবাস্তব।
গণতন্ত্রের স্বাধীনতা শুধু পরিমিত ও মার্জিত সমালোচনার জন্য নয়। মানুষের ক্ষোভ, হতাশা এবং কখনো কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ করার অধিকারও এর অংশ। রাষ্ট্র যদি কেবল পরিশীলিত ভাষায় আপত্তি জানানোর অনুমতি দেয়, কিন্তু তীব্র অসন্তোষ প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কার্যত নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতায় পরিণত হয়।
তবে আদালতের রায়ই শেষ কথা নয়
এখানেই সাম্প্রতিক রায়ের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। সরকারকে অপমানের বিধান বাতিল হলেও প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে ‘অপমান’ থেকে রক্ষার জন্য নতুন দণ্ডবিধির ২১৮ ও ২১৯ ধারা বহাল রয়েছে। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার আইনি কাঠামো এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
:max_bytes(150000):strip_icc()/UNPrinciplesforResponsibleInvestment-a15296d191fc4bab885a3db5325e2fc1.jpg)
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য নং ৩৪-এ স্পষ্ট করা হয়েছে, জনসাধারণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সাধারণ নাগরিকের তুলনায় বেশি মাত্রার সমালোচনা সহ্য করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা ও কঠোর মানহানি আইন তৈরি করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। মানহানির জন্য কারাদণ্ডও উপযুক্ত শাস্তি নয়।
এখানে মূল প্রশ্নটি ব্যক্তিগত সম্মান নয়, ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত দায়িত্ব। কেউ যখন প্রেসিডেন্ট, গভর্নর বা মন্ত্রী হওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাকে সাধারণ নাগরিকের চেয়ে বেশি সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা নিয়েই সেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিও আসে।
ইন্দোনেশিয়ার সামনে এখন সুযোগ
সাংবিধানিক আদালতের রায়কে তাই বিচ্ছিন্ন একটি আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমে যাবে। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—সরকার কি নাগরিকের সমালোচনা থেকে নিজেকে সুরক্ষিত করবে, নাকি নাগরিকের সমালোচনাকে নিজের কার্যক্রম সংশোধনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করবে?
ইন্দোনেশিয়ার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথ এখনো অসম্পূর্ণ। মানহানির অবশিষ্ট বিধান, বক্তব্যের জন্য কারাদণ্ডের সম্ভাবনা এবং আইটিই আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা দূর না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সরকার চাইলে পরবর্তী পদক্ষেপটি স্পষ্টভাবেই নিতে পারে—মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের বদলে দেওয়ানি বিষয়ে পরিণত করা, প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জন্য বিশেষ আইনি সুরক্ষা প্রত্যাহার করা এবং আইসিসিপিআরের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে জাতীয় আইনকে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
সাম্প্রতিক রায় অন্তত দেখিয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এখনো নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াতে পারে। আর শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ মনে করিয়ে দিয়েছে, গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নয়। সংবিধান যখন নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করে, তখন সেই অধিকার বাস্তবায়নের দাবি তোলাও নাগরিকের দায়িত্ব।
এই ছোট জয় তাই কেবল দুটি আইনি ধারা বাতিলের ঘটনা নয়। এটি একটি বড় সত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা—গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকা নয়, বরং সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতায়।
এন্ডি বায়ুনি 



















