ধনী দেশগুলোর স্কুলব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচি বা পিসা পরীক্ষার সর্বশেষ ফলাফল সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পড়া, গণিত ও বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ২০০০ সালে পরীক্ষা শুরুর পর থেকে এখন সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে। করোনা মহামারির সময় স্কুল বন্ধ থাকা ও দীর্ঘদিনের অনলাইন শিক্ষাকে ফল খারাপ হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখানোর সুযোগও আর খুব বেশি নেই। মহামারি শেষ হয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের ফলাফল একই গতিতে নিচের দিকে যাচ্ছে।
অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ৩৫টি দেশের পিসা ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে একজন ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী পড়ার দক্ষতায় প্রায় এক দশক আগের ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর সমান অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ এক প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতায় ধীরে ধীরে বড় ধরনের অবনতি ঘটছে। এটি হঠাৎ কোনো বিপর্যয় নয়; বরং ধীরগতিতে তৈরি হওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট।
পরীক্ষার নম্বর অবশ্যই একটি শিশুর সম্পূর্ণ সক্ষমতার মাপকাঠি নয়। তবে ভালো পরীক্ষার ফল ভবিষ্যতের অনেক ইতিবাচক ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত। যারা পরীক্ষায় ভালো করে, তাদের আয় সাধারণত বেশি হয়, তারা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপন করে এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কম থাকে। একটি হিসাব অনুযায়ী, পিসা পরীক্ষার গড় ফল মাত্র এক-চতুর্থাংশ মান বিচ্যুতি বাড়াতে পারলে ধনী দেশগুলোর বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়তে পারে।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন দ্রুত উন্নত হচ্ছে, তখন শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা কমে গেলে কি সেটি খুব বড় সমস্যা? ভবিষ্যতের মানুষ তো অনেক কঠিন চিন্তার কাজও বুদ্ধিমান যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দিতে পারবে। মানুষ যেমন শারীরিক শ্রমের অসংখ্য কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে করিয়ে নেয়, তেমনি চিন্তার কাজও যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা করে দেয়, তাহলে স্কুলে এত পড়াশোনার প্রয়োজন কী?
বাস্তবে বিষয়টি ঠিক উল্টো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির কারণে মানুষের চিন্তাশক্তির প্রয়োজন কমবে না, বরং আরও বাড়বে। গাড়ি আবিষ্কারের কারণে যেমন মানুষের শরীরচর্চার প্রয়োজন শেষ হয়নি, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষিত করার প্রয়োজনও দূর করবে না।
বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি পৃথিবী তৈরি করছে। সেই পৃথিবীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে মানুষের আরও বেশি মানসিক নমনীয়তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও নতুন পরিস্থিতিতে চিন্তা করার দক্ষতা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কঠিন চিন্তার কাজ অন্যের বা যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়বে। তাই স্কুলগুলোর দায়িত্ব এখন আরও বেশি—শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্ককে নিয়মিত অনুশীলন করানো এবং গভীরভাবে চিন্তা করার অভ্যাস তৈরি করা।
ভাষা পড়া ও বোঝার ক্ষমতা এবং গণিতের মৌলিক দক্ষতা একটি সুগঠিত মস্তিষ্কের ভিত্তি। এসব মৌলিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে শিশুদের বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শিক্ষার্থীদের ফল কমতে শুরু করার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পিসা পরীক্ষার ফলাফল প্রায় ২০১২ সাল থেকে ধীরে ধীরে নিচের দিকে যেতে শুরু করে। এর সঙ্গে ট্যাবলেট, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য পর্দাভিত্তিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের সম্পর্ক থাকার প্রমাণও ক্রমশ বাড়ছে। এসব প্রযুক্তি শিশুদের পড়াশোনা থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে বই পড়ার মতো এমন অনেক শখ থেকেও তাদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে, যেগুলো দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা তৈরি করে।
এ কারণে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে সীমা আরোপ করা যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। বর্তমানে প্রায় অর্ধেক দেশ কোনো না কোনো মাত্রায় স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করেছে। আরও বেশি দেশের এমন ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রযুক্তি অবশ্যই শিক্ষাক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, তবে সেটি পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করতে হবে। নতুন নতুন আকর্ষণীয় প্রযুক্তি ও যন্ত্র অনেক সময় শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবর্তে উল্টো বিভ্রান্ত করে।
তবে প্রযুক্তির বাইরেও শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে আরও গভীর সমস্যা রয়েছে। শিক্ষাবিদদের একটি অংশ পরীক্ষা ও মূল্যায়নকে নেতিবাচকভাবে দেখেছেন। কেউ কেউ মনে করেছেন, পরীক্ষা ক্ষতিকর এবং ভালো-মন্দ নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থাই সমস্যাজনক। আবার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে যৌক্তিক উদ্বেগও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রত্যাশার মাত্রা কমিয়ে দেওয়ার অজুহাতে পরিণত হয়েছে।
করোনা মহামারির সময় তৈরি হওয়া কিছু সমস্যাও পুরোপুরি কাটেনি। অনেক শিশু এখনো আগের তুলনায় বেশি ক্লাস মিস করছে। আবার মহামারির সময় অনেক শিক্ষক মূল্যায়নের মানদণ্ড কিছুটা শিথিল করেছিলেন। কিন্তু তাদের একটি অংশ এখনো সেই কঠোরতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারেননি।
শুধু অর্থ বাড়ালেই সমাধান হবে না
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য শুধু আরও বেশি অর্থ ব্যয় করলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন প্রমাণ খুব বেশি নেই। উদাহরণ হিসেবে জাপানের কথা বলা যায়। দেশটি শিক্ষার্থীপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম ব্যয় করেও অনেক ভালো ফল করে।
তাই প্রয়োজন শুধু অর্থ নয়, কীভাবে পড়ানো হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোন শিক্ষাদান পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর, সে বিষয়ে আরও গবেষণা দরকার। অথচ শিক্ষাক্ষেত্র এখনো কার্যকর শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার ফল যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে অনুসরণ করে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগগুলোরও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে ভালো শেখে, কীভাবে তাদের ফলাফল উন্নত করা যায় এবং কোন ধরনের মূল্যায়ন কার্যকর—এসব বাস্তব প্রশ্নের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
যেসব দেশ শিক্ষার্থীদের ফলাফল কমে যাওয়া ঠেকাতে পেরেছে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। যুক্তরাজ্য তার একটি উদাহরণ। ২০০৯ সালে দেশটির শিক্ষার্থীরা গণিত ও পড়ার দক্ষতায় বিশ্বের শীর্ষ ৩০ দেশের মধ্যে কোনোমতে জায়গা করে নিয়েছিল। এখন তারা শীর্ষ ১০-এর মধ্যে রয়েছে।
ইংল্যান্ডে আগের রক্ষণশীল সরকারের সময় কঠোর পরীক্ষা, কঠিন পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং তথ্যনির্ভর পাঠ্যক্রমের মতো তুলনামূলক পুরোনো ও কঠোর শিক্ষাপদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ এই উন্নতির একটি কারণ হতে পারে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উচ্চ প্রত্যাশা রাখা, নিয়মিত মূল্যায়ন করা এবং মৌলিক জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া এখনও কার্যকর হতে পারে।
তবে শিক্ষাব্যবস্থার এই অবনতি দ্রুত থামানো সম্ভব নয়। একটি শিশুকে শিক্ষিত করতে অনেক বছর সময় লাগে। ফলে আজকের পরীক্ষার ফলাফলে প্রতিফলিত হচ্ছে ১০ থেকে ২০ বছর আগের শিক্ষানীতি ও সিদ্ধান্তের প্রভাব। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারকে রাজনৈতিকভাবে কঠিন করে তোলে।
কোনো সরকার আজ স্কুলের মান উন্নত করার জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেও তার সুফল পরবর্তী নির্বাচনের আগেই দৃশ্যমান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাসংস্কারে বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অতীতে টনি ব্লেয়ার থেকে জর্জ ডব্লিউ বুশ—অনেক রাজনীতিকই শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক রাজনৈতিক নেতা শিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখার বদলে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্র হিসেবে বেশি ব্যবহার করছেন।
এভাবে চলতে থাকলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন ক্রমেই আরও শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান হয়ে উঠছে, তখন মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হওয়া উচিত মানুষের মস্তিষ্ককে আরও শক্তিশালী করে তোলা। যন্ত্র যতই বুদ্ধিমান হোক, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন নিজেরা চিন্তা করতে, পড়তে, হিসাব করতে, প্রশ্ন করতে এবং যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে—স্কুলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেটিই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















