নয়াদিল্লিতে ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলনে একই মঞ্চে দেখা গেল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে তিন নেতার উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সম্প্রসারিত ব্রিকস এখন বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সহযোগিতার বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের ভূমিকা আরও জোরালো করার চেষ্টা করছে।
নয়াদিল্লির এই সম্মেলনে ব্রিকসের সদস্যসংখ্যা বেড়ে ১১-তে দাঁড়িয়েছে। মূল সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ইরান, ইন্দোনেশিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব যুক্ত হয়েছে। এর ফলে বিশ্বের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এখন এই জোটের আওতায় এসেছে।
সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটি ছিল মোদি, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের একসঙ্গে উপস্থিতি। ভারতের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্কের ধরন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়াদিল্লির নিজস্ব কৌশলগত সম্পর্ক—সব মিলিয়ে এই তিন নেতার এক মঞ্চে অবস্থানকে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনের একটি প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে ভারত ও চীনের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত বিরোধের কারণে টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল। তবে এবারের ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে মোদি ও শি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। দুই নেতা মতপার্থক্যকে বিরোধে পরিণত না করার ওপর জোর দিয়েছেন এবং সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর আগে পুতিন ও মোদি বৈঠক করে দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেন। রাশিয়া ব্রিকসকে পশ্চিমা-নির্ভর ব্যবস্থার বাইরে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, অর্থপ্রদান ও বিনিয়োগ সহযোগিতার আরও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
পুতিন ব্রিকসকে একটি নতুন, বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—বিভিন্ন দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সম্পদকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থ আরও জোরালোভাবে প্রতিফলিত হবে।![]()
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও ব্রিকসকে আরও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য, শিল্প, অর্থনীতি ও সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। চীন ব্রিকসের জন্য একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উন্মুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে।
শি আরও বলেছেন, সম্প্রসারিত ব্রিকসের দেশগুলোর শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং একটি সমন্বিত বাজার গড়ে তোলা জরুরি। আগামী বছর ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব চীনের হাতে যাওয়ার আগে বেইজিং জোটটির অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অন্যদিকে মোদি সম্মেলনে সতর্ক করে বলেছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, জলবায়ু সংকট এবং প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ব্যবহারকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করার প্রবণতা বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্রিকসকে সহযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দিকে আরও এগিয়ে যেতে হবে।
সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ভিন্ন অবস্থানে থাকা দেশগুলোকে নিয়ে একটি যৌথ ঘোষণায় উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য বাধার সমালোচনা এবং বিশ্বব্যবস্থায় বহুমুখী কাঠামো ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
ব্রিকসের ভেতরে অবশ্য মতপার্থক্যও রয়েছে। চীন, ভারত ও রাশিয়ার স্বার্থ সব ক্ষেত্রে এক নয়। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা কতটা বাড়ানো হবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে এবং জোটের অর্থনৈতিক সহযোগিতা কতটা বাস্তব রূপ পাবে—এসব প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তিন শক্তিশালী নেতার একই মঞ্চে উপস্থিতি যেমন জোটটির সম্ভাবনা তুলে ধরেছে, তেমনি এর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জও সামনে এনেছে।
তবু এবারের সম্মেলন থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—ব্রিকস আর শুধু উদীয়মান অর্থনীতির একটি সহযোগিতা জোট হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এর প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
নয়াদিল্লির সম্মেলনে পুতিন, মোদি ও শি জিনপিংয়ের একসঙ্গে উপস্থিতি তাই নিছক একটি আনুষ্ঠানিক দৃশ্য নয়। বরং এটি এমন এক সময়ে বৈশ্বিক শক্তির নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যখন পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো নিজেদের জন্য আরও বড় ভূমিকা দাবি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















