মহাকাশ অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে চীন। ৪৮টি অর্থনীতিকে নিয়ে করা একটি নতুন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বেইজিংয়ে সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত ২০২৬ চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সেবা মেলায় প্রকাশিত ‘২০২৬ গ্লোবাল স্পেস ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মহাকাশ অবকাঠামোর সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। মহাকাশভিত্তিক আন্তঃনাক্ষত্রিক সংযোগের দিকে নজর রেখে তৈরি এই মূল্যায়নে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার—দুই ধরনের সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে মহাকাশ অবকাঠামোর আওতায় জীবনধারণ সহায়ক ব্যবস্থা, উৎক্ষেপণ ও পরিবহন ব্যবস্থা, যোগাযোগ, জ্বালানি, আইন ও বিধিবিধান এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি শীর্ষ ১০ অর্থনীতির তালিকায় রয়েছে জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ভারত, ইতালি ও নেদারল্যান্ডস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহাকাশ-সংশ্লিষ্ট সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা ‘হার্ড পাওয়ার’-এর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সবচেয়ে এগিয়ে। জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ভারতও এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে মহাকাশ খাতে নীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, নিয়ম প্রণয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার মতো ‘সফট পাওয়ার’-এর ক্ষেত্রে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ইতালি এগিয়ে রয়েছে।
প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ মহাকাশ প্রতিযোগিতা নিয়েও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত মানুষের মহাকাশ কর্মকাণ্ড মূলত পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যবর্তী কক্ষপথকেন্দ্রিক বা সিসলুনার মহাকাশে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি। ২০৪০ সালের পর পৃথিবী ও মঙ্গলগ্রহের মধ্যবর্তী মহাকাশ উন্নয়নের জন্য আরও বাস্তবসম্মত হয়ে উঠতে পারে। তবে অদূর ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে আন্তঃগ্রহ মহাকাশে প্রবেশ সম্ভব হবে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি মহাকাশকে ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে মহাকাশ অবকাঠামো নির্মাণ কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা অভিযান পরিচালনার বিষয় থাকবে না, বরং রাষ্ট্রগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বেইজিং অ্যাকাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের সহযোগী গবেষণা ফেলো ওয়াং পেং বলেন, মহাকাশশিল্প এখনো বড় পরিসরে স্যাটেলাইট নক্ষত্রমণ্ডল বা বৃহৎ স্যাটেলাইট-সমষ্টি স্থাপনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে আগামী এক দশকে এই খাতে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তার মতে, সিসলুনার মহাকাশই ভবিষ্যতে বৈশ্বিক মহাকাশ প্রতিযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এই প্রতিযোগিতা শুধু নির্দিষ্ট কোনো প্রযুক্তি কে কতটা উন্নত করতে পারছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো মহাকাশভিত্তিক শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন নির্ধারণের ক্ষমতাও প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
ওয়াং পেং বলেন, বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলো এই ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ধরে রাখবে। অন্য দেশ ও অঞ্চলগুলোও মহাকাশ খাতের নির্দিষ্ট ও বিশেষায়িত ক্ষেত্রে নিজেদের জন্য আলাদা পথ তৈরি করতে পারে।
মহাকাশ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে চীনের কয়েকটি বিশেষ সক্ষমতার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথে মানুষ পাঠানো ও দীর্ঘ সময় অবস্থান করানোর সক্ষমতা, সমন্বিত নৌ-পরিচালনা ও পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং বড় আকারের মহাকাশ কর্মসূচি বাস্তবায়নের সাংগঠনিক সক্ষমতা।
পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণযানের মতো কিছু ক্ষেত্রে চীন দ্রুত এগিয়ে আসছে। এসব প্রযুক্তির উন্নয়ন ভবিষ্যতে কম খরচে বাণিজ্যিক মহাকাশ অবকাঠামো স্থাপনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের মহাকাশ অবকাঠামো পৃথিবীর ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হবে। একই সঙ্গে এটি পরবর্তী প্রজন্মের যোগাযোগপ্রযুক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বিত হবে। এর ফলে মহাকাশ অবকাঠামো ভবিষ্যৎ ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে এবং গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির পথও প্রশস্ত করতে পারে।
‘২০২৬ গ্লোবাল স্পেস ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনটি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং, ঝেজিয়াং ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব আরবান ইন্টারন্যাশনালাইজেশন স্টাডিজ, সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স এবং দ্য চাইনিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকং, শেনঝেনের স্কুল অব পাবলিক পলিসিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে প্রকাশ করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















