আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি বাতিল করার কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর ভাষায়, সংস্থাটির শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়। এখন দাতাদের ঋণের ওপর নির্ভর না করে সরকার বন্ড ছেড়ে বাজার থেকে অর্থ তুলবে। রোববার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আয়োজিত এই সপ্তাহ চলবে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের টাকায় দেশ চালানোর দিন শেষ। সরকার দেশের সরকারি অর্থব্যবস্থার কাঠামো বদলাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে নিউইয়র্কে ডলার বন্ড ছাড়া হবে। চীনের বাজারে পান্ডা বন্ড ও জাপানের বাজারে সামুরাই বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনাও আছে। দেশের ভেতরে আসবে স্থানীয় মুদ্রার বন্ড। বাংলাদেশকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ইকুইটি ফান্ডের কথাও বলেন তিনি। মন্ত্রী জানান, বন্ড ও ইকুইটির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বাজার থেকে অর্থ তোলার আহ্বানে ভালো সাড়া মিলছে। মন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে উড়োজাহাজ কেনার মতো বড় কেনাকাটার অর্থও বাজার থেকেই আসা উচিত, সরকারের তহবিল থেকে নয়।
মন্ত্রীর হিসাবে উন্নয়নের জন্য দেশের বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার দরকার। এই অর্থের বড় অংশ তিনি পুঁজিবাজার থেকে তুলতে চান। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতও যেন উচ্চ সুদে ব্যাংকের ওপর নির্ভর না করে বাজার থেকে অর্থ তোলে। এতে ব্যবসার অর্থায়নের খরচ কমবে। এ জন্য সিকিউরিটাইজেশনের মতো নতুন আর্থিক পণ্য আনতে হবে। সরকার চায়, দেশের ভেতরের ঋণের ওপর নিজের নির্ভরতা কমাতে, যাতে বেসরকারি খাত বেশি ঋণ পায়। অর্থমন্ত্রীর এই পরিকল্পনা অনুযায়ী সরকার বাজার থেকে অর্থ তুলবে, আর সেই অর্থে উন্নয়ন প্রকল্প চলবে।
পুঁজিবাজার নিয়েও কড়া কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, গত এক দশকে স্টক এক্সচেঞ্জ ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হয়েছে। বাজারে গভীরতা নেই। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে চাইবে না, যদি বাজার জুয়ার আসরের মতো চলে। তাই সুশাসন ও স্বনিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি করতে হবে বলে মত দেন তিনি। স্বাধীনতার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ চালু ও মিউচুয়াল ফান্ডের সুযোগ তৈরির উদ্যোগকে দূরদর্শী বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো ছাড়া পুঁজিবাজার থেকে বড় অঙ্কের টাকা তোলা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি।
আইএমএফের কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসা একটি বড় নীতিগত মোড়। সমর্থকেরা একে শর্তের চাপ থেকে মুক্তি হিসেবে দেখছেন। তবে প্রশ্নও আছে। ঋণমান দুর্বল থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ছাড়তে বেশি সুদ গুনতে হয়, আর এক দফায় বড় অঙ্ক তোলাও কঠিন। ফলে বছরে ৫ হাজার কোটি ডলারের চাহিদা বাজার থেকে কতটা মেটানো যাবে, সেটি দেখার বিষয়। আইএমএফের সঙ্গে যুক্ত রাজস্ব ও ব্যাংক খাতের সংস্কারও দেশের নিজের প্রয়োজন। সরকার বাজার থেকে অর্থ তুলবে, এই ঘোষণা তখনই সফল হবে, যখন বিনিয়োগকারীরা সংস্কারের ওপর আস্থা পাবেন। আগামী কয়েক মাসে প্রথম ডলার বন্ড কবে ও কী শর্তে আসে, সেটিই হবে এই নীতির প্রথম পরীক্ষা।












