বলিউড অভিনেতা ইমরান খানকে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সরকার। এ নির্দেশকে অসাংবিধানিক ও স্বেচ্ছাচারী দাবি করে বোম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। এর মধ্যেই তাঁর ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ড কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে নতুন করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) হাইকোর্টে আবেদন করেন ইমরান খানের আইনজীবীরা। তাঁদের দাবি, ভারত ছাড়ার নির্দেশটি ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
আবেদনটি আগামী সোমবার (১৯ অক্টোবর) বোম্বে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মহেশ চন্দ্র ত্রিপাঠীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে শুনানির জন্য উঠতে পারে। বিষয়টি দ্রুত শুনানির জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ইমরান।
ভারতের ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) তাঁকে আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। অভিযোগ, বিদেশি নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজিত একটি প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। এ কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইমরান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং ভারতের ওসিআই কার্ডধারী। ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের এই মর্যাদা দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ওসিআই কার্ডধারীদের জন্য ভারতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
তবে ইমরানের আইনজীবীরা বলছেন, ওসিআই কার্ডধারীদের প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার ওপর এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা নেই। তাঁদের দাবি, ইমরান কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকা কিংবা অবাধ চলাচলের অধিকারের পক্ষে কথা বলাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইমরানকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না দিয়েই দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর আইনজীবীরা এ সিদ্ধান্তকে একতরফা, অসাংবিধানিক এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আদালতের কাছে ইমরানের আবেদন, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে যেন কোনো জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়। তাঁকে জোর করে ভারত থেকে ফেরত পাঠানো এবং তাঁর বিরুদ্ধে লুক আউট সার্কুলার (এলওসি) জারি করা থেকেও বিরত থাকার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
নতুন নোটিশ ঘিরে প্রশ্ন
ইমরান হাইকোর্টে আবেদন করার দিনই এফআরআরও তাঁর কাছে আরেকটি নোটিশ পাঠায়। এতে জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন তাঁর ওসিআই কার্ড বাতিল করা হবে না।
ইমরানের আইনজীবীরা বিষয়টিকে তাঁদের মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের প্রশ্ন, প্রথমে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার পর আবার কেন ওসিআই কার্ড বাতিলের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলো?
আইনজীবীদের মতে, এই ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যেতে পারে যে ইমরানের বক্তব্য না শুনেই প্রথম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় নোটিশ থেকে এমন প্রশ্নও উঠছে, কর্তৃপক্ষ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিল কি না এবং এখন আগের সিদ্ধান্তের ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা করছে কি না।
ইমরানের আইনজীবী জুলফিকার মেমন জানিয়েছেন, তাঁরা নতুন নোটিশটি পর্যালোচনা করছেন। তাঁর বক্তব্য, আদালতের শুনানিতে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। কোন নোটিশ কার্যকর বলে বিবেচিত হবে—প্রথমটি, নাকি দ্বিতীয়টি—তা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলবেন। দ্বিতীয় নোটিশ প্রাসঙ্গিক হলে প্রথম নোটিশের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধানের দুই অনুচ্ছেদের উল্লেখ
হাইকোর্টে করা আবেদনে ইমরান দাবি করেছেন, তাঁকে অন্য কাউকে আড়াল করার জন্য বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
আবেদনে ভারতের সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে আইনের চোখে সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২১ অনুচ্ছেদের কথাও বলা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছে।
ইমরানের যুক্তি, ভারত ছাড়ার নির্দেশ বহাল থাকলে তা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতির লঙ্ঘন হবে এবং সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী হবে। তাই নোটিশের কার্যকারিতা স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ৭ডি(ই) ধারায় দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত কর্মকাণ্ডের কারণে ওসিআই কার্ড বাতিলের বিধান রয়েছে।
৪৪ বছর বয়সী ইমরান খান যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এবং বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা আমির খানের ভাতিজা।












