চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনতে এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সোনার মজুত বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছেন চীনের সাধারণ মানুষ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সোনার চাহিদা বৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়না (পিবিওসি) টানা ২৩তম মাসের মতো সোনা কিনেছে। ওই মাসে ব্যাংকটি প্রায় ২৩ টন সোনা মজুত করে, যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে এক মাসে সর্বোচ্চ ক্রয়। এর ফলে চীনের ঘোষিত সরকারি সোনার মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪১০ টনে।
সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ চীনের সরকারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সোনার অংশ বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল
চীনের সোনা কেনার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারভিত্তিক সম্পদের ওপর নির্ভরতা কমানো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণপত্রের পরিবর্তে এমন সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াতে চাইছে বেইজিং, যার মূল্য ও নিরাপত্তা অন্য কোনো দেশের সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশে থাকা প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করে। এ ঘটনা বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিদেশি আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।
নিজ দেশের ভেতরে সংরক্ষিত সোনা অন্য দেশের সরকারের পক্ষে সহজে জব্দ বা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা সম্ভব নয়। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি মোকাবিলায় সোনাকে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে চীন।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় দেশটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এ পরিস্থিতিতে নিজেদের রিজার্ভে বিকল্প সম্পদের অংশ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে বেইজিং।
সোনার দিকে ঝুঁকছেন সাধারণ চীনারাও
শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়, চীনের সাধারণ মানুষের মধ্যেও সোনা কেনার প্রবণতা বাড়ছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সম্পদের মূল্য ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় অনেকেই সোনার বার ও কয়েন কিনছেন।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনে সোনার বার ও কয়েন কেনার পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
দেশটির আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে মন্দার চাপে রয়েছে। অতিরিক্ত নির্মাণ, বাড়ির দাম কমে যাওয়া এবং সম্পত্তি বাজারে দুর্বলতার কারণে এই খাতে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমেছে। অন্যদিকে শেয়ারবাজারের দুর্বল পরিস্থিতিও বিনিয়োগকারীদের বিকল্প খুঁজতে উৎসাহিত করছে।
এ অবস্থায় ব্যাংকে অর্থ রাখা বা প্রচলিত বিনিয়োগের বাইরে সম্পদের মূল্য ধরে রাখার মাধ্যম হিসেবে সোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মধ্যে সোনাকে নিরাপদ সঞ্চয়ের একটি উপায় হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার প্রবণতা
চীনের এই উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো, নিজেদের রিজার্ভকে আরও স্থিতিশীল করতে সোনার মজুত বাড়াচ্ছে। পোল্যান্ডও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা মূলত রিজার্ভে ধীরে ধীরে বৈচিত্র্য আনার প্রক্রিয়া। এর অর্থ এই নয় যে দেশগুলো অবিলম্বে মার্কিন ডলার পরিত্যাগ করতে চাইছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলার এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সোনা কেনা অব্যাহত রাখলে ভবিষ্যতে মার্কিন সরকারি ঋণপত্রের চাহিদায় প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, রিজার্ভের একটি বড় অংশ সোনায় স্থানান্তরিত হলে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডসহ ডলারভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগের অংশ তুলনামূলকভাবে কমতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এখনো পিছিয়ে চীন
সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল পরিমাণ সোনা কিনলেও মোট মজুতের দিক থেকে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সোনার মজুত ৮ হাজার ১৩৩ টনের বেশি, যা চীনের ঘোষিত মজুতের তিন গুণেরও বেশি।
তবে চীনের ধারাবাহিক সোনা কেনার তাৎপর্য শুধু মজুতের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে দেশটি বৈদেশিক সম্পদের ঝুঁকি কমানো, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা জোরদারের চেষ্টা করছে।
সব মিলিয়ে, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সাধারণ মানুষের সোনা কেনার প্রবণতা দেশটির অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রত্যাশা—দুইয়েরই প্রতিফলন। তবে ডলারের আধিপত্য দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বরং সোনার বাড়তি মজুতের মাধ্যমে চীন তার বৈদেশিক সম্পদের ঝুঁকি ছড়িয়ে দিতে এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে চাইছে।












