কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আয় নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস সোমবার এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। তবে তেলের দাম কমায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ফিউচার ও সরকারি বন্ডে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। অন্যদিকে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা ছাড়ানোয় বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলেছে।
১৯ অক্টোবরের বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের নজর রয়েছে এআই খাতের বড় কোম্পানিগুলোর আয়, জ্বালানি তেলের দাম, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের দিকে।
এশিয়ার শেয়ারবাজারে মিশ্র চিত্র
সোমবার জাপানের নিক্কেই সূচক ০.৭ শতাংশ কমেছে। এর আগে গত সপ্তাহে সূচকটি ৫.৪ শতাংশ হারিয়েছিল। প্রযুক্তি খাতের দুর্বলতা এবং এআই অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক কসপি ০.৬ শতাংশ বেড়েছে। গত সপ্তাহে সূচকটি ১৪ শতাংশের বেশি কমেছিল। তাইওয়ানের শেয়ারবাজারের সূচক কমেছে ১.১ শতাংশ। জাপান বাদে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজারগুলোর এমএসসিআই সূচকও ০.২ শতাংশ কমেছে।
ইন্দোনেশিয়ার বাজারে পরিস্থিতি ছিল আরও খারাপ। দেশটির প্রধান শেয়ারসূচক জাকার্তা কম্পোজিট ইনডেক্স ৫ শতাংশ পড়ে যায়। আন্তর্জাতিক সূচক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআই ইন্দোনেশিয়াকে উদীয়মান বাজারের তালিকা থেকে সরিয়ে স্বতন্ত্র বাজারের মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে—এমন ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
তেলের দাম কমায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্বস্তি
রাশিয়ার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে পরে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার বলেছিলেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার অর্থনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনায় প্রেসিডেন্টের ৬০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১.৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৭.৮৩ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও ১.২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০.২০ ডলারে দাঁড়ায়।
তবে হরমুজ প্রণালিতে আরেকটি তেলবাহী জাহাজ মাইনে আঘাত করেছে বলে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে জাহাজ পরিবহন ও বিমা ব্যয় বেড়ে থাকায় বাস্তবে সরবরাহের জন্য তেলের দাম এখনো তুলনামূলক বেশি রয়েছে।
তেলের দাম কমার পাশাপাশি শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা সরকারি বন্ডের চাহিদা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ৪ বেসিস পয়েন্ট কমে ৫.০৫২৫ শতাংশে নেমেছে। এর আগে গত সপ্তাহে বন্ডটির ইল্ড আট মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতন দেখেছিল।
এদিকে, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ফিউচার ০.৮ শতাংশ এবং নাসডাকের ফিউচার ১.৩ শতাংশ বেড়েছে।
চীনের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ইঙ্গিত
চীনের অর্থনীতি চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৫ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসের তুলনায় সামান্য বেশি।
দেশটির খুচরা বিক্রয় বেড়েছে ১.১ শতাংশ। অন্যদিকে, শিল্প উৎপাদন বেড়েছে ৫.৫ শতাংশ, যা বাজারের পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের পর চীনের প্রধান ব্লু-চিপ শেয়ারগুলোর সূচক সিএসআই ৩০০ বেড়েছে ০.১ শতাংশ। চীনা মুদ্রা ইউয়ানের দরও শক্তিশালী হয়েছে। প্রতি ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের বিনিময় হার ৬.৬৮২৮-এ পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর থেকে মুদ্রাটির সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান।
চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা ছাড়ানোয় বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তবে এশিয়ার অন্য বাজারগুলোতে প্রযুক্তি খাতের অনিশ্চয়তা সেই ইতিবাচক প্রভাবকে সীমিত করেছে।
এআই খাতের বিনিয়োগ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ আয় এবং এআই অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল ব্যয় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বিশ্ববাজারের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এএমপির অর্থনীতিবিদ মাই বুইয়ের মতে, এআই থেকে অর্জিত আয় বিপুল প্রাথমিক বিনিয়োগের খরচ পুষিয়ে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরেই চিন্তিত। পাশাপাশি, সময়ের সঙ্গে এআই অবকাঠামোর মূল্য কমে গেলে কোম্পানিগুলোর হিসাবভুক্ত সম্পদের মূল্যও হ্রাস পেতে পারে।
সরকারি বন্ডের ইল্ড বৃদ্ধি এবং করপোরেট ঋণের সুদ ব্যবধান বাড়লে কোম্পানিগুলোর অর্থায়ন ব্যয়ও বেড়ে যায়। এতে নতুন ঋণ নেওয়া, পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন এবং এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে।
গত সপ্তাহে ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক ১১.৪ শতাংশ কমেছে। ২০০৮ সালের পর এটিই ছিল সূচকটির দীর্ঘতম ধারাবাহিক দরপতনের ঘটনা।
বড় প্রযুক্তি কোম্পানির আয়ের দিকে নজর
চলতি সপ্তাহে একাধিক বড় প্রযুক্তি কোম্পানির আর্থিক ফল প্রকাশিত হবে। বুধবার মেটার আয় প্রকাশের কথা রয়েছে। একই দিনে চিপ নির্মাতা ল্যাম রিসার্চ ও টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলাও তাদের ফল জানাবে। ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ফল প্রকাশের কথা রয়েছে মঙ্গলবার।
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, এআই অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগকারী পাঁচটি হাইপারস্কেল প্রযুক্তি কোম্পানির সম্মিলিত মূলধনি ব্যয় আগামী বছর প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
মেটা ২০২৬ সালে মূলধনি ব্যয় বাবদ ১৩০ বিলিয়ন থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার খরচের প্রত্যাশা করছে। কোম্পানিটি এই ব্যয় আরও বাড়ালে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তি খাতের বাইরেও চলতি সপ্তাহে নেটফ্লিক্স, প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল, জেনারেল মোটরস এবং জিই অ্যারোস্পেসের আর্থিক ফল প্রকাশিত হবে।
এত অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বড় মুনাফার কারণে সামগ্রিকভাবে কোম্পানিগুলোর আয় প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। তাই প্রকাশিত আর্থিক ফল এবং ভবিষ্যৎ আয়ের পূর্বাভাস বাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইউরোপের বাজারে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
ফ্রান্সে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাম্প্রতিক দাঙ্গার প্রভাব ইউরোপীয় শেয়ারবাজারেও পড়েছে। ইউরো স্টক্স ৫০ ফিউচার ০.৩ শতাংশ, জার্মানির ড্যাক্স ফিউচার ০.২ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ফিউচার ০.১ শতাংশ কমেছে।
রাজনৈতিক উদ্বেগের মধ্যে ইউরোর দর ০.১ শতাংশ কমে প্রতি ডলারে ১.১২৩২-এ নেমেছে। গত সপ্তাহে ইউরোর দর ১৬ মাসের সর্বনিম্ন ১.১১১৩ ডলারে পৌঁছেছিল।
অন্যদিকে, জাপানি ইয়েনের বিপরীতে ডলারের দর প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ১৫৮.০৭-এ রয়েছে। জাপান সরকার মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে—এমন আশঙ্কায় ডলারের দর চলতি মাসে তুলনামূলক সীমিত পরিসরে ওঠানামা করছে।
স্বর্ণের বাজারে কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। সুদের আয় না দেওয়া এই মূল্যবান ধাতুর দাম ০.৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৮১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বন্ডের ইল্ড কমে যাওয়া স্বর্ণের দামের পক্ষে সহায়ক হয়েছে।
সামনে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্ববাজারে এখন একসঙ্গে কয়েকটি বিষয় প্রভাব ফেলছে—এআই খাতে বিনিয়োগের টেকসই সম্ভাবনা, বড় প্রযুক্তি কোম্পানির আয়, তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। চীনের অর্থনৈতিক তথ্য কিছুটা স্বস্তি দিলেও এশিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর বাজারগুলোতে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
আগামী কয়েক দিনে মেটাসহ বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফল এবং মূলধনি ব্যয় নিয়ে নতুন তথ্য বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সিদ্ধান্ত এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি তেলের বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
সব মিলিয়ে, তেলের দাম কমায় ওয়াল স্ট্রিটের ফিউচার ও বন্ডে স্বস্তি ফিরলেও বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে কি না, তা নির্ভর করছে কোম্পানিগুলোর আয়, অর্থায়ন ব্যয় এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।












