ভারতে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদনশিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ ঘিরে দেশটির অন্তত ১০টি রাসায়নিক কোম্পানি নতুন ব্যবসায় প্রবেশের পরিকল্পনা করেছে। তবে চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অতি বিশুদ্ধ রাসায়নিক ও গ্যাস উৎপাদনের প্রযুক্তি, উন্নত অবকাঠামো এবং ক্রেতাদের আস্থা অর্জন সহজ নয়। এ কারণে ভারতের কয়েকটি কোম্পানি দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে।
ভারত বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম রাসায়নিক উৎপাদক দেশ। সাধারণ ও বিশেষায়িত রাসায়নিক উৎপাদনে দেশটির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহৃত উপকরণের বিশুদ্ধতার মান অনেক বেশি কঠোর। ফলে বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই চিপ নির্মাতাদের সরবরাহকারী হওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
চিপ তৈরিতে প্রয়োজন অতি বিশুদ্ধ উপকরণ
সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে ১৫০টির বেশি ধরনের রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে অতি বিশুদ্ধ সালফিউরিক অ্যাসিড ও হাইড্রোফ্লোরিক অ্যাসিড। এ ছাড়া হিলিয়াম ও সিলেনসহ ৩০টির বেশি ধরনের গ্যাস প্রয়োজন হয়।
এসব উপকরণে ধাতব কণা ও আর্দ্রতার উপস্থিতি প্রতি বিলিয়ন বা ট্রিলিয়ন অংশের মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সামান্য দূষণও চিপ উৎপাদনের ফলন কমিয়ে দিতে পারে। বিশ্বে এসব উপকরণের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীও সীমিত; তাদের বড় অংশ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত।
ভারতের রাসায়নিক শিল্পের বিশেষজ্ঞ অজয় জোশির মতে, দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান এখনো নিজস্ব উদ্যোগে অতি বিশুদ্ধ রাসায়নিক উৎপাদনের প্রক্রিয়া সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে নতুন কোম্পানিগুলোর সামনে প্রযুক্তি অর্জন ও ক্রেতাদের আস্থা তৈরির বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
বিদেশি অংশীদারত্বে প্রযুক্তি অর্জন
গুজরাটভিত্তিক আকুটাস কেমিক্যালস ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার জে অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গঠন করে। এই উদ্যোগের নাম ইন্ডিকেম। চলতি বছরের আগস্টে দক্ষিণ কোরিয়ার গংজু শহরে প্রতিষ্ঠানটির কারখানা উদ্বোধন করা হয়।
কারখানাটিতে মূলত ফটোরেজিস্ট রাসায়নিক তৈরি করা হবে। সিলিকন ওয়েফারের ওপর চিপের সার্কিটের নকশা তৈরিতে এসব উপকরণ ব্যবহৃত হয়। ২০২৮ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরের মধ্যে বাণিজ্যিক আয় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আকুটাসের কৌশলবিষয়ক প্রধান অভিষেক প্যাটেল জানিয়েছেন, কম খরচে রাসায়নিক সংশ্লেষণের দক্ষতা ভারতের রয়েছে। কিন্তু অতি বিশুদ্ধ উপকরণ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিশোধন প্রযুক্তির ঘাটতি পূরণে দক্ষিণ কোরীয় অংশীদার সহায়তা করছে।
ভারতে একই প্রযুক্তিতে কারখানা গড়া সম্ভব হলেও অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও স্থানীয় শিল্পব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সরবরাহকারী হিসেবে অনুমোদন পেতেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই ভারতের বাজার যথেষ্ট প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত ইন্ডিকেম দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে সরবরাহের দিকে মনোযোগ দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণে এগোচ্ছে আনুপাম
ভারতের আনুপাম রাসায়ন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের জেহক ফাইন কেমিক্যালস অধিগ্রহণ সম্পন্ন করেছে। এর মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় কোম্পানিটি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গোপাল আগরওয়ালের মতে, চিপ শিল্পে প্রবেশের জন্য দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ক্রেতাদের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেহকের আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত গ্রহণযোগ্যতা আনুপামের বাজারে প্রবেশের সময় কমাতে সহায়তা করছে। নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য এই সরবরাহব্যবস্থায় জায়গা করে নিতে অন্তত ১০ বছর লাগতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গ্যাস উৎপাদনেও বাড়ছে বিনিয়োগ
চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত কিছু গ্যাস আমদানি করা কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভারতে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে। ইনক্স এয়ার প্রোডাক্টস গুজরাটে বিশেষায়িত গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহকেন্দ্র স্থাপনে ৫০০ কোটি রুপি, অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ করছে।
প্রতিষ্ঠানটির কৌশল ও ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান দিগন্ত শর্মা জানিয়েছেন, অতি বিশুদ্ধ গ্যাস উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও পরিশোধনব্যবস্থা এখনো আমদানি করতে হয়। সরবরাহকারীদের অনুমোদন পেতে কয়েক মাস সময় লাগে। পাশাপাশি গ্যাস কারখানা নির্মাণে প্রায় ৯ থেকে ৩০ মাস লাগতে পারে। তাই উৎপাদনকেন্দ্র চালুর সময়ের সঙ্গে চিপ কারখানার কার্যক্রম শুরুর সময় মেলানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের টাটা গোষ্ঠীর নির্মাণাধীন প্রথম চিপ কারখানায় ২০২৮ সালের মাঝামাঝি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে। এদিকে টাটা ইলেকট্রনিকস জাপানের সুমিতোমো কেমিক্যাল ও ফুজিফিল্ম এবং জার্মানির মার্ক ইলেকট্রনিকসের সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর উপকরণ ও গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়েছে।
দেশীয় কোম্পানিগুলোর জন্য এই কারখানা ভবিষ্যতে বড় ক্রেতা হয়ে উঠতে পারে। তবে কঠোর মানদণ্ড, দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠাই হবে ভারতের রাসায়নিক শিল্পের জন্য মূল পরীক্ষা।












