তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কৌতুক করায় কারাগারে যেতে হয়েছিল জনপ্রিয় স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান দেনিজ গোকতাসকে। তিন মাস কারাগারে কাটিয়ে মুক্তি পেলেও নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসতে রাজি নন ৩২ বছর বয়সী এই কৌতুকশিল্পী। তাঁর বিশ্বাস, ভয় ও শাস্তির আশঙ্কা উপেক্ষা করে সত্য বলার সাহস দেখানো শিল্পীদের দায়িত্ব।
গোকতাসের দ্বিতীয় স্ট্যান্ডআপ অনুষ্ঠান ‘ডেড সি’ ইউটিউবে প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত জুনে প্রকাশিত অনুষ্ঠানটি এরই মধ্যে দেড় কোটির বেশিবার দেখা হয়েছে। প্রেসিডেন্টকে অপমান করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয় এবং ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে ১৯ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
কারাগার থেকে বেরিয়ে প্রথম সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গের শক্তি নিয়ে কথা বলেছেন দেনিজ গোকতাস।
যে কৌতুকে বিপত্তি
এরদোয়ানকে নিয়ে কৌতুক করার আগে দর্শকদের সতর্ক করেছিলেন গোকতাস, যেন কোনো বিপদে পড়তে যাচ্ছেন। একটি কৌতুকের বক্তব্য ছিল, প্রেসিডেন্ট একজন ‘লাজুক স্বৈরশাসক’ থেকে এখন নিজের অবস্থান নিয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও স্বচ্ছন্দ এক শাসকে পরিণত হয়েছেন।
গোকতাসের মতে, তাঁর কৌতুক খুব কঠোর ছিল না। অতীতে তুরস্কের মূলধারার টেলিভিশনে এর চেয়েও তীক্ষ্ণ কৌতুক প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ সহ্য করার প্রবণতা অনেক কমে গেছে।
কারাগারেও অনুশোচনা নেই
কারাগারে থাকার সময় তিনি প্রায় ২০ মিনিটের নতুন কৌতুক লিখেছেন, যা আগামী বছর মঞ্চে পরিবেশনের পরিকল্পনা আছে। তিনি জানান, জনপ্রিয়তা যত বাড়ছিল, হারানোর ভয়ও তত বাড়ছিল। ফলে নিজের কাজে আত্মনিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে শুরু করেছিলেন।
কিন্তু তাঁর অনুষ্ঠানে আসা শিক্ষার্থী থেকে অবসরপ্রাপ্ত মানুষেরা দৈনন্দিন জীবনে তাঁর চেয়ে বেশি সাহস দেখান বলে মনে হতো তাঁর। এতে নিজেকে ভণ্ড মনে হচ্ছিল। সেই অবস্থা থেকে বেরোতেই আবার নিজের কাছে মজার মনে হওয়া কৌতুক বলতে শুরু করেন, পরিণতি যা-ই হোক। তিনি বলেন, কারাগারে প্রথম রাতে জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘুম ঘুমিয়েছিলেন।
আদালতে মতপ্রকাশের পক্ষে বক্তব্য
বিচারের সময় গোকতাস শুধু অভিযোগের জবাব দেননি, মুক্ত সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্ট্যান্ডআপ কমেডির ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত কৌতুকশিল্পী লেনি ব্রুসের উদাহরণ টানেন। ১৯৬৪ সালে একটি পরিবেশনার কারণে ব্রুসের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। প্রায় চার দশক পর নিউইয়র্কের গভর্নর তাঁকে মরণোত্তর ক্ষমা করেন।
গোকতাস বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু তুরস্কের সমস্যা নয়। বিশ্বের অনেক জায়গায় মানুষ শাস্তি বা জনসমালোচনার ভয়ে কথা বলতে সাহস পায় না। অন্য কৌতুকশিল্পীদের তিনি দেখাতে চেয়েছেন, ভয় না পেয়েও কথা বলা সম্ভব।
কৌতুক কি স্বৈরাচার ঠেকাতে পারে
এ প্রশ্নে গোকতাস অতিরিক্ত আশাবাদী নন। তাঁর মতে, কৌতুক সহমর্মিতা তৈরি করতে পারে, অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে এবং কথা বলার সাহস বাড়াতে পারে। কিন্তু একা কোনো কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা বদলে দিতে পারে না। তবু এটি মানুষের জন্য একধরনের মানসিক সমর্থন। এক দর্শক ইউটিউবে লিখেছিলেন, অনুষ্ঠানটি দেখে তাঁর মনে হয়েছে তিনি যেন স্বাধীন দেশে বাস করছেন।
গোকতাস বলেন, জীবনের যে সময়ে তিনি সবচেয়ে কম একা বোধ করেছেন, সেটি কারাগারের সময়। ব্যক্তিগত জীবনে নিজেকে কিছুটা ভীতু ও সামাজিকভাবে অস্বস্তিপূর্ণ মনে করলেও এই অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মসংশয় অনেকটাই কাটিয়ে দিয়েছে।
কেন কৌতুকশিল্পীরা লক্ষ্য
গোকতাসের মতে, কৌতুকশিল্পীদের কাজের মধ্যেই প্রচলিত ধারণা ও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার বিষয়টি থাকে। তাই সরকারগুলো শুধু তাঁদের নয়, বৃহত্তর পরিসরে মানুষের মতপ্রকাশ সীমিত করতে চায়। তাঁর ব্যঙ্গ, যুক্তরাষ্ট্রে কৌতুকশিল্পীরা অনলাইন আক্রমণ ও বয়কটের ভয়ে থাকেন, আর তুরস্কে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারাগারের ঝুঁকি।
‘ডেড সি’ অনুষ্ঠানে তাঁর মাথার একটি বিশাল প্রতিরূপ দেখা যায়, যা গিলোটিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। মৃত্যু ও সেন্সরশিপ অনুষ্ঠানটির কেন্দ্রীয় বিষয়। তাঁর অনুপ্রেরণা লেনি ব্রুস, ডগ স্ট্যানহোপ ও জর্জ কার্লিন। তবে নিজের মামলাকে ভবিষ্যৎ কৌতুকের প্রধান বিষয় না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
আপিলের আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি নতুন কৌতুক তৈরি করছেন দেনিজ গোকতাস। তাঁর কাছে কৌতুকের সাফল্য শুধু দর্শক হাসানো নয়, এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে মানুষ ভয় ছাড়া কথা বলার সাহস পায়।












