রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নিজ শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। রোববার ভোরে চালানো এ হামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। এতে অন্তত একজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২টি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ও দুটি বাড়ি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর শহরটিতে এটিকে অন্যতম বড় ড্রোন হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত সমঝোতা ভেঙে পড়ার পর ইউক্রেন এই হামলা চালাল। এর আগে কয়েক দিন ধরে রাশিয়ার অভ্যন্তরে জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা থেকে বিরত ছিল কিয়েভ।
জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলা
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও গত এক সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনের তেল ও গ্যাস খাতে ৭৬ বার হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং কয়েক হাজার পরিবারের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়েছে।
রোববার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার হামলার প্রধান লক্ষ্য জ্বালানি স্থাপনা। ইউক্রেনের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে মস্কো।

জেলেনস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়ার অব্যাহত হামলার জবাব দিতেই ইউক্রেন আবারও রুশ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
তেল স্থাপনায় আগুন, আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী
সেন্ট পিটার্সবার্গের তেল অবকাঠামোর বিভিন্ন স্থাপনা, বিশেষ করে একটি তেল সংরক্ষণাগারে হামলার পর বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে ছড়িয়ে পড়ে।
শহরটির আঞ্চলিক গভর্নর আলেকজান্ডার দ্রোজদেনকো জানিয়েছেন, রুশ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ওই অঞ্চলে ইউক্রেনের ১৪৫টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, রাতভর শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। শহরের কেন্দ্রীয় এলাকাতেও বিস্ফোরণের শব্দ পৌঁছায়।
তিনি বলেন, যুদ্ধ এবার তাঁদের শহরেও এসে পৌঁছেছে। এত দিন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বাসিন্দারা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, এবার তাঁদেরও সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এত দিন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি বলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
রাশিয়াজুড়ে হাজারো ড্রোন হামলার দাবি
সেন্ট পিটার্সবার্গে হামলাটি ছিল ইউক্রেনের বৃহত্তর ড্রোন অভিযানের অংশ। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার দেশজুড়ে এক হাজারের বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এর মধ্যে মস্কো অঞ্চলও রয়েছে।

তেল স্থাপনার পাশাপাশি রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিকে-এর একটি তথ্যকেন্দ্র এবং অনলাইন বিপণন প্রতিষ্ঠান ওজনের একটি গুদামেও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
হামলার পর ভিকে ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ সেবা বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ করেন। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের সেবা স্বাভাবিকভাবেই চালু রয়েছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির মতবিরোধ বাড়ছে
সাম্প্রতিক সময়ে জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। রাশিয়ার প্রতি তুলনামূলকভাবে অনুকূল বলে মনে হওয়া মার্কিন পদক্ষেপের সমালোচনা করে আসছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
গত ৯ অক্টোবর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে। ইরানের চাপের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘদিন ধরে চড়া রয়েছে।
এ ছাড়া দ্বিদলীয় সমর্থনে পাস হওয়া একটি আইনের আওতায় রাশিয়ার ওপর আরোপিত অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে জেলেনস্কিকে পদত্যাগ করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার কারণে জ্বালানির দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ করে আসছিলেন ট্রাম্প। আগামী নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে জ্বালানির উচ্চমূল্য রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ইউক্রেন জানিয়েছে, তাদের সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থার সামরিক সংস্করণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা বিধিনিষেধের মুখে পড়তে শুরু করেছে। তবে এই বিঘ্নের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
মস্কোর হুঁশিয়ারি
সেন্ট পিটার্সবার্গে হামলার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ইউক্রেনের হামলার জবাবে রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কিয়েভ প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এতে ঘটনাপ্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেন্ট পিটার্সবার্গে এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকায় দুই দেশের জ্বালানি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।












