একসময় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি। ধারণা ছিল, মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, অর্থনীতি, খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবা দিয়ে সেই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই আশঙ্কার জায়গায় নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে জন্মহার এত দ্রুত কমছে যে ভবিষ্যতে এসব অঞ্চলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা সংকুচিত হতে পারে। যে দেশগুলো একসময় বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি হিসেবে দেখত, তাদের এখন ভাবতে হচ্ছে, আগামী প্রজন্মের আকার ছোট হয়ে গেলে অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কী হবে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু জনসংখ্যার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শ্রমবাজার, উৎপাদন, ভোগ, পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থার ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। উন্নত দেশগুলো এত দিন উন্নয়নশীল বিশ্বের তরুণ অভিবাসীদের শ্রমশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু যেসব দেশ থেকে এই শ্রমিকেরা আসেন, সেখানেই যদি জন্মহার ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে অভিবাসনের মাধ্যমে শ্রমিকের ঘাটতি পূরণ করাও কঠিন হতে পারে।
এটি রাতারাতি ঘটবে না। তবে জনমিতিক পরিবর্তন ধীরে ধীরে এগোয় বলে তার পরিণতি অনেক সময় সামনে আসার আগ পর্যন্ত গুরুত্ব পায় না। লাতিন আমেরিকার জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, অঞ্চলটি কি তুলনামূলক সমৃদ্ধ হওয়ার আগেই বয়স্ক মানুষের আধিক্য এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংকোচনের মুখে পড়তে যাচ্ছে?
জনসংখ্যার পুরোনো হিসাব আর কার্যকর নয়
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ হেসুস ফার্নান্দেস-ভিয়াভের্দে এবং নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষক প্যাট্রিক নররিক তাঁদের ‘টেরা ইনকগনিটা: দ্য ইকোনমিকস অব আ শ্রিংকিং ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক গবেষণায় বিশ্বের জনসংখ্যার প্রবণতা বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের অনুসন্ধানে দেখা যায়, জন্মহারের পতন শুধু ধনী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, বিশেষ করে দরিদ্র ও কম শিক্ষিত নারীদের মধ্যে, এই পতন উল্লেখযোগ্যভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এশিয়ায় পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট হলেও লাতিন আমেরিকাও একই প্রবণতার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
জনসংখ্যা কমার অর্থ অবশ্যই এই নয় যে কোনো দেশের মোট জনসংখ্যা এখনই কমতে শুরু করবে। জন্মহার কমলেও আগের প্রজন্মের বড় আকার এবং মানুষের আয়ু বৃদ্ধির কারণে মোট জনসংখ্যা আরও কিছুদিন বাড়তে পারে। কিন্তু জন্মহার দীর্ঘ সময় প্রতিস্থাপনমাত্রার নিচে থাকলে একপর্যায়ে নতুন প্রজন্মের আকার আগের প্রজন্মের তুলনায় ছোট হয়ে আসে। বয়স্ক মানুষের মৃত্যু এবং নতুন প্রজন্মের তুলনামূলক কম সংখ্যার সম্মিলিত প্রভাবে তখন জনসংখ্যা সংকুচিত হতে পারে।
গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী, ২০২৬ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে জন্মহার জনসংখ্যা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁদের হিসাব সত্য হলে, বৈশ্বিক জনসংখ্যা প্রায় ২০৫৬ সালে ৯০০ কোটির কাছাকাছি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এরপর প্রথমে ধীরগতিতে এবং পরে দ্রুত জনসংখ্যা কমতে শুরু করতে পারে।
এটি এখনো একটি পূর্বাভাস, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। জন্মহার, আয়ু, অভিবাসন এবং সরকারি নীতির পরিবর্তনে জনসংখ্যার গতিপথ বদলাতে পারে। তারপরও এই সম্ভাবনা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনমিতিক পরিবর্তন একবার গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে অল্প সময়ে তা উল্টে দেওয়া কঠিন।

লাতিন আমেরিকায় পরিবর্তনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
লাতিন আমেরিকার জনসংখ্যাগত রূপান্তরকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হলো, অঞ্চলটির বহু দেশ এখনো উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারেনি। সাধারণত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পরিবার ছোট হওয়ার সম্পর্ক দেখা গেছে। আয় বাড়লে, শিক্ষা বিস্তৃত হলে এবং শিশুমৃত্যুর হার কমলে পরিবারগুলো কম সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, তুলনামূলক কম আয়ের দেশেও জন্মহার অত্যন্ত নিচে নেমে যেতে পারে।
গবেষকদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মেক্সিকোর মোট প্রজনন হার ছিল আনুমানিক ১ দশমিক ৫১। যুক্তরাষ্ট্রের অশ্বেতাঙ্গ হিস্পানিক নন এমন জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ছিল ১ দশমিক ৫৭। অথচ মেক্সিকোর মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ আয়ের বড় ব্যবধান থাকলেও মেক্সিকোর জন্মহার যুক্তরাষ্ট্রের ওই জনগোষ্ঠীর চেয়ে কম।
কলম্বিয়ায় প্রজনন হার নেমে এসেছে ১ দশমিক ০১-এ। ব্রাজিলে এই হার ১ দশমিক ৫২। দুটি দেশই মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে, অথচ তাদের জন্মহারও নিম্নমুখী।
এই পরিসংখ্যান পুরোনো একটি ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে: মানুষ যত দরিদ্র, তাদের সন্তান নেওয়ার প্রবণতা তত বেশি হবে। বাস্তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, নগরজীবনের ব্যয়, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, বিয়ের সময় এবং পরিবার গঠনের সামাজিক ধারণা মিলিয়ে সিদ্ধান্তটি অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
একটি দেশ যদি ধনী হওয়ার আগেই জন্মহারের নিম্নগতি ও জনসংখ্যার বার্ধক্যের মুখোমুখি হয়, তাহলে সমস্যাটি দ্বিগুণ হতে পারে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করতে হবে, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর পেনশন, চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যয়ও বহন করতে হবে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা সংকুচিত হলে এই ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় কর ও উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির আতঙ্ক থেকে উল্টো বাস্তবতায়
মাত্র অর্ধশতাব্দী আগে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ ছিল আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। ১৯৭০-এর দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও উন্নয়নের বাধা হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল প্রবল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনার ধারণাও তখন ব্যাপক আলোচনায় ছিল।
দক্ষিণ আমেরিকা নিয়ে ১৯৭১ সালে সাংবাদিক অ্যালিস্টার হর্নের ভ্রমণবিষয়ক লেখায় দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ হিসেবে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কথা উঠে এসেছিল। তাঁর আশঙ্কা ছিল, ক্রমবর্ধমান জন্মহারের ফলে তৈরি হওয়া চাহিদার সঙ্গে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি তাল মেলাতে পারবে না।
পরবর্তী সময়েও জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দেখেছেন অনেকে। তবে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ পিটার বাউয়ার এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পরিবার পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত মানুষ সাধারণত নিজেদের স্বার্থ, বাস্তব পরিস্থিতি ও প্রত্যাশা বিবেচনা করেই নেয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নামে সরকার, করপোরেশন কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নীতির প্রতি তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, জনসংখ্যা নিয়ে অতীতের উদ্বেগের পাশাপাশি বিপরীত ঝুঁকিটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত জনসংখ্যা যেমন কোনো দেশের সম্পদ, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে অতি কম জন্মহারও অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে।
তবে এ দুই পরিস্থিতিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাসের ফল নির্ভর করে উৎপাদনশীলতা, সম্পদের বণ্টন, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রের নীতির ওপর। মানুষের সংখ্যা কমলেই অর্থনীতি অনিবার্যভাবে দুর্বল হবে, এমন নয়। কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রস্তুতি না থাকলে ঝুঁকি বাড়বে।
কেন সন্তান নেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে
জন্মহার কমার কারণ সম্পর্কে গবেষকেরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। এর পেছনে একটিমাত্র কারণ কাজ করছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তবে আধুনিক সমাজে সন্তান নেওয়া ও সন্তান না নেওয়ার অর্থনৈতিক হিসাব বদলে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
একটি পরিবারে প্রথম সন্তান আসার পর দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তৃতীয় সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যয় এক নয়। বড় পরিবারের জন্য বাড়তি বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা এবং সময়ের প্রয়োজন হয়। নগরজীবনে এসব ব্যয় আরও বেশি অনুভূত হতে পারে। অন্যদিকে সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে এসব আর্থিক ও সময়গত দায় এড়ানো সম্ভব হয়।

কর্মজীবী নারী ও পুরুষের জন্য পরিবার গঠনের সঙ্গে পেশাগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করাও বড় প্রশ্ন। বিয়ে ও মাতৃত্বের বয়স পিছিয়ে যাওয়ার ফলে সন্তান নেওয়ার জন্য হাতে থাকা সময়ও কমে আসতে পারে। তবে এসব কারণের গুরুত্ব দেশ, সমাজ ও পরিবারের পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
গবেষণায় উঠে আসা আরেকটি বিষয় হলো, নারী-পুরুষের তুলনামূলক বেশি সমতা রয়েছে এমন দেশগুলোতে অনেক সময় জন্মহারও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব ভাগাভাগির সুযোগ থাকলে সন্তান নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত কিছু বাধা কমতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্মহার লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের চেয়ে বেশি হওয়ার পেছনে এই ধরনের সামাজিক পার্থক্য আংশিক ভূমিকা রাখতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা রয়েছে। শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য অর্থসাহায্য দিলেই জন্মহার বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে সন্তান নেওয়ার উৎসাহ দিতে ভর্তুকি দেওয়া হলেও এসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। সন্তান লালন-পালনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়, কর্মজীবনে বিরতি, আবাসন এবং পরিচর্যার দায় যদি একইভাবে থেকে যায়, তাহলে এককালীন বা সীমিত আর্থিক প্রণোদনা পরিবারের সিদ্ধান্ত বদলাতে নাও পারে।
রাষ্ট্রের প্রস্তুতি এখনই দরকার
জন্মহার কমে যাওয়া নিজে থেকেই কোনো বিপর্যয় নয়। ছোট জনসংখ্যার কিছু সুবিধাও থাকতে পারে। মানুষের সংখ্যা কমলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আবাসন, অবকাঠামো, প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের ওপর চাপ কমতে পারে। প্রযুক্তি এবং উৎপাদনশীলতার উন্নতির মাধ্যমে কম কর্মী দিয়েও বেশি উৎপাদন সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু এসব সম্ভাব্য সুবিধা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে অর্থনীতি কীভাবে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ায় তার ওপর। একটি সমাজে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমে গেলে একই সঙ্গে পেনশনভোগী, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের অনুপাত বাড়তে পারে। তখন তুলনামূলক ছোট কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর কর ও সামাজিক ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি পাবে।
যেসব কল্যাণব্যবস্থা বর্তমান কর্মজীবী মানুষের কর থেকে অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটায়, সেগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। জন্মহার কমতে থাকার অর্থ হলো, আজকের শিশুরাই ভবিষ্যতের কর্মী, করদাতা এবং সেবাদানকারী। তাদের সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে দীর্ঘমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনায় সেই বাস্তবতা প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

লাতিন আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই একাধিক কাজ রয়েছে। পেনশনব্যবস্থার আর্থিক স্থায়িত্ব মূল্যায়ন, স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ চাহিদা নিরূপণ, শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি পরিবার গঠনের পথে থাকা বাস্তব বাধাগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিবাসন নীতিকে দীর্ঘমেয়াদি শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার।
তবে জন্মহার বাড়ানোর নামে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে জবরদস্তি করা কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। পরিবার কত সন্তান নেবে, সেই সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বজায় রেখেই সরকারকে এমন পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করতে হবে, যেখানে সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা থাকলে আবাসন, শিক্ষা, পরিচর্যা ও কর্মজীবনের বাধা পরিবারকে নিরুৎসাহিত না করে।
শেষ পর্যন্ত লাতিন আমেরিকার জনসংখ্যাগত পরিবর্তন একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক রূপান্তরের অংশ। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর শুধু তরুণ জনসংখ্যার সুবিধা নিয়ে পরিকল্পনা করলে চলবে না। তাদের ভাবতে হবে, ভবিষ্যতে শ্রমিক কমে গেলে উৎপাদন কীভাবে বাড়বে, সামাজিক নিরাপত্তা কীভাবে অর্থায়ন করা হবে এবং বয়স্ক নাগরিকদের জন্য কী ধরনের সেবা প্রয়োজন হবে।
একসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা নীতিনির্ধারকদের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। এখন বিপরীত প্রবণতার জন্যও প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এসেছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো যদি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার আগেই বয়স্ক জনসংখ্যার চাপের মুখে পড়ে, তাহলে তাদের উন্নয়নের পথ আরও কঠিন হতে পারে। এই ঝুঁকি এড়ানোর প্রথম শর্ত হলো, জনসংখ্যার পরিবর্তনকে দূরের কোনো পরিসংখ্যানগত বিষয় না ভেবে আজকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা।













