ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা কোথায় বাড়ছে, তা আগেভাগে জানাতে একটি স্মার্ট ফাঁদ তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। এডিস মশার স্মার্ট ফাঁদটির নাম রাখা হয়েছে মাস্ট-ক্লাউডনেট। এটি শব্দ দিয়ে মশা টেনে আনে। এরপর ক্যামেরায় ছবি তুলে এআই দিয়ে মশার প্রজাতি শনাক্ত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষকেরা যৌথভাবে যন্ত্রটি তৈরি করেছেন। গবেষণাটি ৮ অক্টোবর আইইইই ট্রানজ্যাকশনস অন ইনস্ট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
ফাঁদটির কাজের ধরন বেশ সহজ। উড়ন্ত স্ত্রী এডিস মশার ডানা ঝাপটানোর একটি নির্দিষ্ট শব্দ আছে। পুরুষ মশা সেই শব্দে আকৃষ্ট হয়। ফাঁদটি একই রকম শব্দ বাজায়। কাছে আসা পুরুষ মশাকে ভেতরের একটি পাখা টেনে নিয়ে আঠালো কাগজে আটকে ফেলে। ভেতরের ক্যামেরা ধরা পড়া মশার ছবি তুলে ক্লাউড সার্ভারে পাঠায়। সেখানে এআই মডেল মশার প্রজাতি চিনে নেয় এবং ফল একটি ড্যাশবোর্ডে দেখায়। ফলে মাঠে না গিয়েও দূর থেকে মশার অবস্থা দেখা যায়। প্রচলিত পদ্ধতিতে মশার সংখ্যা জানতে মাঠকর্মীদের ফাঁদ বসিয়ে হাতে ধরে মশা গুনতে ও চিনতে হয়। এতে সময় লাগে, ভুলের সুযোগও থাকে। নতুন ফাঁদে সেই কাজ যন্ত্র আর এআই নিজেই করে। ফলও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ড্যাশবোর্ডে চলে আসে। এতে কোন এলাকায় আগে ব্যবস্থা নিতে হবে, তা দ্রুত ঠিক করা সহজ হয়।
প্রশ্ন আসতে পারে, কামড়ায় তো স্ত্রী মশা, তাহলে পুরুষ মশা ধরা কেন। গবেষকেরা বলছেন, পুরুষ এডিস মশা স্ত্রী মশার আগে পূর্ণবয়স্ক হয়। তারা প্রজননস্থলের কাছাকাছিই থাকে। তাই কোনো এলাকায় পুরুষ মশা বেশি ধরা পড়লে বোঝা যায়, সেখানে নতুন মশা জন্মাচ্ছে। এটিই ডেঙ্গু ঝুঁকির আগাম সংকেত। গবেষণাগারের পরীক্ষায় শব্দযুক্ত ফাঁদে একই রকম নীরব ফাঁদের চেয়ে গড়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরা পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিন দিনের মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেও ফাঁদটি ৪৯টি এডিস মশা ধরেছে।
খরচের দিক থেকেও এডিস মশার স্মার্ট ফাঁদ সাশ্রয়ী। প্রতিটি ফাঁদ তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় ১২ হাজার টাকা। বাজারে প্রচলিত একই ধরনের ফাঁদের দাম ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। বিদ্যুৎ চলে গেলে ব্যাটারিতে ফাঁদটি প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা চলতে পারে। গবেষক দল আগামী বছরের জুন ও জুলাইয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি ফাঁদ বসানোর পরিকল্পনা করছে। এতে কোন এলাকায় মশা বাড়ছে, তার একটি মানচিত্র তৈরি করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গবেষণা তহবিল থেকে এই কাজের অর্থ এসেছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন প্রায় সারা বছরের দুশ্চিন্তা। হাসপাতালে রোগী বাড়লে তবেই অনেক সময় মশা নিধনে জোর দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এডিস মশার স্মার্ট ফাঁদ সেই দেরি কমাতে পারে। আগেভাগে জানা গেলে সিটি করপোরেশন নির্দিষ্ট এলাকায় লার্ভা ধ্বংস ও ওষুধ ছিটানোর কাজ আগে শুরু করতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম উদ্ভাবনটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কোথায় মশা বাড়ছে তা জানা গেলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। এখন দেখার বিষয়, পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর যন্ত্রটি নগরের নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কত দ্রুত জায়গা পায়।












