ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন বর্জ্য রপ্তানি নীতির কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশের ইস্পাত স্ক্র্যাপ আমদানি। ইইউর খসড়া তালিকায় কাগজ ও রাবার বর্জ্য নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে অনুমোদিত দেশ হিসেবে রাখা হয়েছে। কিন্তু ধাতব বর্জ্যের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে ২০২৭ সালের ২১ মে থেকে ইউরোপ থেকে লোহার স্ক্র্যাপ আনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দেশের ইস্পাতশিল্পের প্রধান কাঁচামাল এই স্ক্র্যাপ। পুরোনো জাহাজ, যন্ত্রপাতি, গাড়ি আর ভাঙা লোহা গলিয়েই কারখানাগুলো রড ও অন্যান্য ইস্পাত পণ্য তৈরি করে। তাই খবরটি রড ও ইস্পাত উৎপাদকদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার।
নতুন নিয়মের ভিত্তি ইইউর বর্জ্য পরিবহনবিষয়ক বিধিমালা ২০২৪/১১৫৭। এই নিয়মে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ওইসিডির বাইরের দেশগুলো কেবল তালিকাভুক্ত বর্জ্যই ইইউ থেকে নিতে পারবে। এ জন্য দেশটিকে প্রমাণ করতে হবে, সে ওই বর্জ্য পরিবেশসম্মতভাবে সামলাতে পারে। ধাতব বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর পদার্থ বের হতে পারে। এই জায়গাতেই বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত ও পাকিস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশও ধাতব বর্জ্যের খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
বাংলাদেশের ইস্পাতশিল্প কতটা আমদানিনির্ভর, তা সংখ্যায় স্পষ্ট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫২ লাখ ৯০ হাজার টন লোহার স্ক্র্যাপ আমদানি হয়েছে। দেশে স্ক্র্যাপ তৈরি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টন। অর্থাৎ মোট প্রায় ৬২ লাখ ৯০ হাজার টন সরবরাহের প্রায় ৮৪ শতাংশই এসেছে বিদেশ থেকে। শিল্প বিশ্লেষক এবং জাগুয়ার রিসোর্স অ্যান্ড ক্যাপিটালের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ইফতেখার আহমেদ জানান, একসময় দেশের মোট স্ক্র্যাপ আমদানির ৬০ শতাংশের বেশি আসত ইইউর দেশগুলো থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সম্প্রতি ইউরোপ থেকে আমদানি কিছুটা কমেছে। তবু দীর্ঘ মেয়াদে এই বাজার হারানোর ঝুঁকি বড়।
সরকার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মাহবুবা খাতুন মিনু। তিনি বলেন, তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য বাংলাদেশ আবেদন করেছে এবং আবেদনটি পর্যালোচনার মধ্যে আছে। ইইউর তালিকাটি এখনো খসড়া পর্যায়ে। প্রথম চূড়ান্ত তালিকা চলতি বছরের শেষ নাগাদ গ্রহণ করার কথা। অর্থাৎ বাংলাদেশের হাতে এখনো কিছুটা সময় আছে। এই সময়ে পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রমাণ দিতে পারলে ধাতব বর্জ্যের তালিকায় জায়গা পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। শিল্প বিশ্লেষকেরাও বলছেন, পরিবেশ মানদণ্ড মেনে চলাই এখানে মূল চাবিকাঠি।
সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি দূরের মনে হলেও এর প্রভাব পড়তে পারে ঘরের কাছেই। বাড়ি, সেতু, সড়ক থেকে শুরু করে বড় সরকারি প্রকল্প, সবখানেই রড লাগে। ইউরোপ থেকে ইস্পাত স্ক্র্যাপ আমদানি বন্ধ হলে কারখানাগুলোকে অন্য দেশ থেকে কাঁচামাল খুঁজতে হবে। তাতে খরচ বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত রডের দামে প্রতিফলিত হতে পারে। তাই ২০২৭ সালের মে মাসের আগে ইস্পাত স্ক্র্যাপ আমদানি নিয়ে ইইউর সঙ্গে সমাধান খোঁজা শিল্প ও সরকার দুই পক্ষের জন্যই জরুরি। একই সঙ্গে বিকল্প উৎস তৈরি এবং দেশের ভেতরে স্ক্র্যাপ সংগ্রহ বাড়ানোর পথও ভাবতে হবে।












